খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
স্নাতকোত্তর চিকিৎসা প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত নতুন নীতিমালার প্রতিবাদ এবং ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দুই দিনব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন শেষে এবার অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশন। আজ রোববার সকাল ৮টা থেকে এই কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। একই দাবিতে সংহতি প্রকাশ করে আজ সকাল ১১টার পর থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন, যার ফলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
শনিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ইন্টার্ন চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মো. ইরফানুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমকে জানানো হয়। নিজেদের অধিকার ও দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আজ বেলা ১১টায় হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করার জন্য আন্দোলনকারীরা সমবেত হন।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সুনির্দিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, সম্প্রতি দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এফসিপিএস (বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জনস) প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত একটি নতুন আদেশ জারি করে। সেই আদেশে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের নির্দিষ্ট কিছু বিভাগে নতুন করে চিকিৎসকদের পদায়ন বন্ধ করা, চিকিৎসকদের জন্য প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে ন্যূনতম দুই বছর বাধ্যতামূলক চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং মেধাভিত্তিক সীমিত ভাতার মতো কিছু কঠোর বিধান যুক্ত করা হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবার থেকেই চিকিৎসকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের দাবি, তাদের উত্থাপিত ছয় দফা দাবির মধ্যে প্রথম দাবিটি আংশিক বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হলেও, বাকি মূল দাবিগুলো নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও কোনো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই তারা এই কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
চিকিৎসকদের পেশাগত নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ভাতার অধিকার নিশ্চিত করতে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ছয়টি প্রধান দাবি নিচে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট দাবি ও লক্ষ্যসমূহ |
| ১ | স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের গত ১৯ মে জারি করা স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনটি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নতুন প্রাজ্ঞপ্তিক নির্দেশনা প্রদান। |
| ২ | চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে ‘স্বাস্থ্যকর্মী সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে তা বাস্তবায়ন করা। |
| ৩ | ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বর্তমান মাসিক ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং সরকারি চিকিৎসকদের জন্য একটি আলাদা ও স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো তৈরি করা। |
| ৪ | বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) স্বাস্থ্য ক্যাডারে সাধারণ চিকিৎসকদের আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩৪ বছর নির্ধারণ করা। |
| ৫ | বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন-২০২৫-কে অস্থায়ী অধ্যাদেশের পরিবর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী আইনে রূপান্তর করা এবং ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। |
| ৬ | বিএমডিসি এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত সকল প্রকার উচ্চতর ভর্তি পরীক্ষার ফি সর্বোচ্চ এক হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। |
চিকিৎসকদের এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ১৯ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে যে বিতর্কিত নীতিমালাটি জারি করা হয়েছিল, তা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বিসিপিএস কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভার সিদ্ধান্তের আলোকেই আপাতত উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের বাধ্যতামূলক শর্তটি বাতিল করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, এফসিপিএস প্রথম পর্বে উত্তীর্ণ সকল বেসরকারি প্রশিক্ষণার্থীরা এখন থেকে বিসিপিএস স্বীকৃত সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিলে নিয়মিত সরকারি মাসিক প্রশিক্ষণ ভাতার আওতাভুক্ত হবেন বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে এই আংশিক পদক্ষেপকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে মানতে নারাজ আন্দোলনরত ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাকিব হোসেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা সাধারণ ও অসহায় রোগীদের জীবন এবং তাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে শুরুতেই কর্মবিরতিতে যাইনি। আমরা প্রশাসনকে প্রথমে ৪৮ ঘণ্টা এবং পরবর্তীতে আরও ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের মূল দাবিগুলো পূরণে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় এবং আমাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় আমরা অত্যন্ত বাধ্য হয়েই এই অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের ছয়টি দাবি সম্পূর্ণভাবে আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই রাজপথের আন্দোলন ও কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।