খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলা সদরে অবস্থিত ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিৎ কর্মকারকে বিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে মারধর করার ঘটনা ঘটেছে। আজ রোববার সকালে বিদ্যালয়ের ফটকে কয়েকজন তরুণ তাঁকে অবরুদ্ধ করে বিদ্যালয়ে প্রবেশে বাধা দেন এবং একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে দেন। অটোরিকশার ভেতরেও তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই শিক্ষককে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ মুঠোফোনে এই মারধরের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করেন।
ডামুড্যা থানা ও বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক সূত্র থেকে জানা যায়, সুজিৎ কর্মকার ২০১৩ সালে ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। দায়িত্ব পালনকালে আনুমানিক দুই বছর আগে স্থানীয় একটি পক্ষের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর বিরোধের সৃষ্টি হয়। ওই পক্ষটি তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রীদের হেনস্তা করার অভিযোগ তোলে। এই বিরোধের জের ধরে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে সুজিৎ কর্মকার বিদ্যালয়ে যাননি এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ছুটির মাধ্যমে কর্মস্থল থেকে দূরে অবস্থান করছিলেন।
দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার পর, সম্প্রতি তিনি ডামুড্যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) অবহিত করে আজ সকালে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বিদ্যালয়ে পৌঁছান। অটোরিকশা থেকে নামার পরপরই তিনি অতর্কিত আক্রমণের শিকার হন।
মারধরের শিকার হওয়ার পর সুজিৎ কর্মকার প্রথমে নিরাপত্তার স্বার্থে ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। তবে সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বোধ না করায় তিনি উন্নত চিকিৎসা ও সুরক্ষার জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে স্থানান্তরিত হন। পরবর্তীতে তাঁর স্বজনেরা তাঁকে সেখানে ভর্তি করান।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ফারহানা ডেইজি চিকিৎসাধীন শিক্ষকের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানান, সুজিৎ কর্মকার নামের ওই ব্যক্তির শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাঁর মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ মারধরের কারণে ফুলে গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে।
আহত প্রধান শিক্ষক সুজিৎ কর্মকার অভিযোগ করে বলেন, “২০২৪ সালে সরকার পতনের পর ডামুড্যার একটি মহল আমাকে নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল। বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন ওই পক্ষকে মদদ দিতেন। নিরাপত্তার অভাবে আমি দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে যেতে পারছিলাম না। সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানিয়ে আজ বিদ্যালয়ে যাই। ওই চক্রের সদস্যরা বিদ্যালয়ের গেটে আমাকে বেদম মারধর করেছেন।” তিনি সুস্থ হয়ে এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান।
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন তাঁর সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে বলেন, প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় স্থানীয় কিছু অভিভাবক তাঁকে বাধা দিয়েছেন এবং প্রবেশ করতে দেননি বলে তিনি শুনেছেন। প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই এবং কেন তাঁকে এই ঘটনার জন্য দায়ী করা হচ্ছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
ডামুড্যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আইয়ূবী জানান, স্থানীয় ঝামেলার কারণে প্রধান শিক্ষক প্রায় দুই বছর ধরে বিভিন্ন ছুটিতে ছিলেন এবং বিদ্যালয়ে আসতে পারছিলেন না। আজ কর্মস্থলে ফেরার পথে গেটে মারধরের শিকার হওয়ার বিষয়টি প্রধান শিক্ষক তাঁকে মুঠোফোনে অবহিত করার পর তিনি ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠান।
ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে মারধর করার তথ্য তাঁরা পেয়েছেন। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভুক্তভোগী শিক্ষকের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ প্রাপ্তিসাপেক্ষে পুলিশ পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনা এবং এ সংক্রান্ত প্রশাসনিক বিবরণের একটি সারসংক্ষেপ নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও ঘটনার বিবরণ |
| ভুক্তভোগী ও পদবি | সুজিৎ কর্মকার, প্রধান শিক্ষক (নিয়োগ: ২০১৩ সাল) |
| অভিযুক্ত পক্ষসমূহ | স্থানীয় একদল তরুণ এবং মদদ দেওয়ার অভিযোগে সহকারী প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন |
| ঘটনার স্থান ও সময় | ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ফটক; আজ রোববার সকাল |
| বর্তমান চিকিৎসাস্থল | শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল (জরুরি বিভাগ) |
| শারীরিক আঘাতের প্রকৃতি | মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন স্থান স্ফীত ও আঘাতপ্রাপ্ত |
| অনুপস্থিতির সময়কাল | ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন ছুটিতে ছিলেন |
| থানার প্রাথমিক পদক্ষেপ | মৌখিক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে পুলিশ প্রেরণ; লিখিত অভিযোগের অপেক্ষা |
ভুক্তভোগী শিক্ষক সুস্থ হওয়ার পর লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।