খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
দেশের কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের ব্যবসায়ীদের চলতি মূলধনের প্রাপ্যতা সহজ করতে ৫,০০০ কোটি টাকার একটি নতুন পুনরর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জারি করা একটি নীতিমালার মাধ্যমে এই বিশেষ তহবিলের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বেগবান করার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে এই তহবিলটি গঠন করা হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজে পরিচালনা করবে। এই তহবিলের আওতায় উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে বা মুনাফায় ঋণ সুবিধা পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই বিশেষ ঋণ সুবিধাটি প্রাথমিকভাবে তিন বছর মেয়াদে কার্যকর থাকবে। তবে এটি একটি আবর্তনশীল তহবিল হওয়ায়, ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থ পুনরায় নতুন উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করা যাবে। এর ফলে এই কর্মসূচিটি দীর্ঘ সময় ধরে দেশের উৎপাদন ও সেবা খাতকে সহায়তা দিতে পারবে।
এই তহবিলের আওতায় অংশগ্রহণকারী তফসিলি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে পুনরর্থায়ন সুবিধা লাভ করবে। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে গ্রাহক বা উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে কোনোভাবেই ৯ শতাংশের বেশি সুদের হার আদায় করা যাবে না। দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোও তাদের নিজস্ব শরিয়াহ-সম্মত অনুমোদিত অর্থায়ন কাঠামোর আওতায় এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। বিদ্যমান ব্যাংকিং বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত মাশুল বা কমিশন ব্যতীত ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ওপর অন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ বা ফি আরোপ করতে পারবে না।
তহবিলের প্রধান শর্ত ও আর্থিক বিন্যাস নিচে ছকের মাধ্যমে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
| প্রধান প্রধান বিষয়াবলি | নির্ধারিত শর্ত ও হার |
| তহবিলের মোট আর্থিক আকার | ৫,০০০ কোটি টাকা |
| প্রাথমিক পরিচালন সময়সীমা | ৩ বছর (আবর্তনশীল) |
| ব্যাংক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার | ৪ শতাংশ |
| গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদের হার | ৯ শতাংশ |
| ঋণের মূল কিস্তি পরিশোধের রেয়াতকাল | ৩ থেকে ৬ মাস |
এই পুনরর্থায়ন সুবিধাটি মূলত সেইসব কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যারা চলতি মূলধনের অভাবে তাদের পূর্ণ উৎপাদন বা সেবা প্রদানের সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। যেসব ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে অন্য কোনো আর্থিক প্রকল্পের আওতায় চলতি মূলধন ঋণ সুবিধা ভোগ করছেন, তারাও ব্যাংকিং নিয়মকানুন এবং নির্ধারিত সীমা সাপেক্ষে এই তহবিল থেকে নতুন করে ঋণের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
তবে ঋণ শৃঙ্খলার স্বার্থে এই নীতিমালায় কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ঋণ তথ্য ব্যুরোর কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন, তবে তারা এই তহবিলের আওতায় কোনোভাবেই ঋণ সুবিধা পাবেন না। সাধারণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে এই ঋণের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত রেয়াতকাল বা গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা প্রদান করা হবে, যে সময়ে ঋণের মূল কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না।
বাংলাদেশে কর্মরত সকল তফসিলি ব্যাংক এই পুনরর্থায়ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। তবে যেসব ব্যাংকের অগ্রিম-আমানত অনুপাত বা ঋণ-আমানত অনুপাত ৭০ শতাংশের বেশি রয়েছে, তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এই পুনরর্থায়ন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার পাবে। এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে আগ্রহী ব্যাংকগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট’-এর সাথে একটি অংশগ্রহণ চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।
ঋণ সুরক্ষার স্বার্থে ব্যাংকগুলো প্রয়োজন মনে করলে গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত জামানত বা সহায়ক জামানত গ্রহণ করতে পারবে। তবে বিতরণকৃত ঋণ আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এবং ঝুঁকি সংশ্লিষ্ট অংশগ্রহণকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এই ঋণ কর্মসূচি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি চলতি মূলধনের সংকট দূর করে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার করবে।