খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম মহানগরে আসার পথে পুলিশের এক জন সদস্যের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক তথা এক লাখ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে মহানগরীর বাকলিয়া থানা পুলিশ। তবে এই ঘটনায় আইনানুযায়ী কোনো মামলা দায়ের না করে উদ্ধারকৃত ইয়াবা বড়িগুলো সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করা হয়। সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশেই মাদক বহনকারীকে কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া ছেড়ে দেওয়া হয় এবং এই গুরুতর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন সেই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ও সত্যতা বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এই তদন্ত প্রতিবেদনটি গত ২৯শে এপ্রিল পুলিশ সদর doptor বা দপ্তরে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রায় ছয় মাস অতিবাহিত হতে চললেও এখন পর্যন্ত থানায় কোনো নিয়মিত বা ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়নি। যদিও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দ্রুত মামলা করার জোরালো সুপারিশ করা হয়েছিল। একই সাথে, আত্মসাৎ হওয়া সেই এক লাখ ইয়াবা বড়িও পুলিশ এখন পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারেনি এবং মাদক পাচারে সরাসরি অভিযুক্ত সেই পুলিশ সদস্যকেও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
মাদক বড়ি গায়েবের ঘটনা এবং এর সাথে জড়িত বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের বর্তমান অবস্থা নিচে ছকের মাধ্যমে বিস্তারিত উপস্থাপন করা হলো:
| পুলিশ কর্মকর্তার নাম ও পদবি | ঘটনার সময়কার দায়িত্ব | গৃহীত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও বর্তমান অবস্থা |
| আফতাব উদ্দিন (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) | বাকলিয়া থানার প্রধান কর্মকর্তা | কোতোয়ালি থানায় বদলি (এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি) |
| তানভীর আহমেদ (পরিদর্শক-তদন্ত) | বাকলিয়া থানার পরিদর্শক | গত ৯ই জুন চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত |
| ইমতিয়াজ হোসেন (কনস্টেবল) | আদালতের বিচারকের দেহরক্ষী | মাদক বহনকারী, বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত |
| মো. আল-আমিন সরকার (উপপরিদর্শক) | বাকলিয়া থানার উপপরিদর্শক | অপরাধে সরাসরি জড়িত থাকায় সাময়িক বরখাস্ত |
| মো. আমির হোসেন (উপপরিদর্শক) | বাকলিয়া থানার উপপরিদর্শক | অপরাধে সরাসরি জড়িত থাকায় সাময়িক বরখাস্ত |
| পাঁচ জন সহকারী উপপরিদর্শক ও কনস্টেবল | বাকলিয়া থানার মাঠপর্যায়ের কর্মী | অপরাধে সহযোগিতা করায় সাময়িক বরখাস্ত |
ছয় পৃষ্ঠার সুদীর্ঘ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কনস্টেবল ইমতিয়াজ কক্সবাজারের মো. মোশাররফ নামের এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবাভর্তি একটি ভ্রমণ ব্যাগ বা লাগেজ নিয়ে ঢাকাগামী একটি দূরপাল্লার বাসে ওঠেন। এই কাজের বিনিময়ে তাঁকে আশি হাজার টাকা দেওয়ার চুক্তি করা হয়েছিল। গাড়িটি কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার সহকারী উপপরিদর্শক সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ পোশাকে থাকা পুলিশের এক জন তথ্যদাতা বাসটিতে ওঠেন। তাঁরা বাসের ভেতর ঘুমন্ত যাত্রী ইমতিয়াজকে জাগিয়ে তুললে তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন এবং পরিচয়পত্র প্রদর্শন করেন। এরপর তাঁকে বাস থেকে নামিয়ে সেতুসংলগ্ন পুলিশ বক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর বাসের তত্ত্বাবধায়ক বা সুপারভাইজার সেখানে গেলেও উপপরিদর্শক আমির হোসেন তাঁকে বাস নিয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
জিজ্ঞাসাবাদে কনস্টেবল ইমতিয়াজ জানান, পুলিশ বক্সের ভেতর সাধারণ পোশাকে বাকলিয়া থানার পরিদর্শক তানভীর আহমেদ এবং উপপরিদর্শক আল-আমিন সরকার উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ব্যাগটি খোলার পর ভেতরে বিপুল পরিমাণ মাদক দেখতে পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাগের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইমতিয়াজ নিজেকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে পুলিশ সদস্যরা নিজেদের মধ্যে গোপন আলোচনা করেন। এরপর প্রতি প্যাকেটে দশ হাজার করে মোট এক লাখ ইয়াবা বড়ি পুলিশ সদস্যরা নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেন এবং খালি ব্যাগটি ইমতিয়াজকে ফেরত দিয়ে দেন। ইমতিয়াজ তথা মাদক বহনকারীকে কোনো প্রকার আইনি ঝামেলা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়, যিনি পরবর্তীতে একটি অটোরিকশা নিয়ে কুমিলল্লায় নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে যান।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আফতাব উদ্দিনকে সরাসরি অভিযুক্ত করে বলা হয়েছে যে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৪৬ ধারা অনুযায়ী মাদকসংক্রান্ত অপরাধগুলো সম্পূর্ণ আমলযোগ্য অপরাধ। তা সত্ত্বেও অপরাধীকে মাদকসহ আটকের পর মামলা না করে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ প্রবিধানের ২৪৪ বিধি চরমভাবে লঙ্ঘন করেছেন, যা পুলিশ আইনের ২৯ ধারার অধীনে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলের ধারণকৃত আলোকচিত্র বা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও সংরক্ষণ করেননি। অন্যদিকে, বর্তমানে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আফতাব উদ্দিন তাঁর বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, তিনি এই বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং ঘটনার সময় তিনি নিজের বাসায় অবস্থান করছিলেন।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুস সাত্তার এই প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে জানান, মাদক উদ্ধারের অপরাধটি আমলযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসামিকে ছেড়ে দিয়ে চরম অপরাধ করেছেন। এই বিষয়ে অবিলম্বে একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা রুজু করে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা এবং জব্দ তালিকা প্রস্তুত না করার কারণ উদঘাটন করা উচিত। মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানান, তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা মেলায় পরিদর্শকসহ নয় জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বিভাগীয় মামলাটির তদন্ত কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। নবযোগদানকৃত মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এই বিষয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা এবং এত দিন কেন এই ঘটনায় নিয়মিত মামলা করা হয়নি, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।