খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার এক মাসের মাথায় রাজধানী ঢাকার রামপুরায় দুর্বৃত্তদের সশস্ত্র হামলার শিকার হয়েছিলেন পুলিশের সাবেক তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন খান পলাশ (৫০)। অপরাধজগতে ‘কাইল্যা পলাশ’ নামে সুপরিচিত এই ব্যক্তি মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার এক সপ্তাহ পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। গণমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান।
পুলিশ প্রশাসনের নথিপত্র এবং পূর্বের অপরাধের রেকর্ড অনুযায়ী, ইয়াছিন খান পলাশ একসময় ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অপরাধজগতের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন। ২০০২ সালের ২৯ মে রামপুরা এলাকায় যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজানকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। উক্ত মিজানুর রহমান মিজান হত্যা মামলার প্রধানতম আসামি ছিলেন পলাশ। পরবর্তীতে বিচারিক আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। তবে উচ্চ আদালত তথা আপিল বিভাগ তাঁর সাজা সংশোধন ও হ্রাস করে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন। এই মামলায় দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর কারাভোগ করার পর বিগত মে মাসে আদালত থেকে জামিন পেয়ে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেছিলেন তিনি। কারাবিধি অনুসারে সাজা হ্রাস পাওয়ার পর তিনি শেষমেশ জামিনে বেরিয়ে আসেন।
কারামুক্তির ঠিক এক মাস পর, গত ১২ জুন বেলা পৌনে ২টার দিকে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনের ঠিক উল্টো পাশে, মক্কি মসজিদ গলির মুখের প্রধান সড়কে অবস্থিত লাবিবা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে পলাশ হামলার শিকার হন। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জুমার নামাজ শেষ করে নিজের বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেলে করে আসা একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত তাঁকে লক্ষ্য করে আকস্মিক গুলি চালায়। দুর্বৃত্তদের ছোড়া দুটি গুলি সরাসরি তাঁর মাথায় আঘাত করে। রক্তাত্ব ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় পলাশের ছেলে ইউসুফ খান পলক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে তাঁকে রামপুরার ডেল্টা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার স্বার্থে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে দুই দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার ও মাথায় অস্ত্রোপচার করার পর, গত রোববার রাতে পরিবারের সিদ্ধান্তে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই বর্বরোচিত গুলির ঘটনার পর ইয়াছিন খান পলাশের স্ত্রী মাহমুদা খানম বাদী হয়ে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেছিলেন, যা এখন হত্যাকাণ্ডের মামলায় রূপান্তরিত হবে। মামলার এজাহারে অন্য এক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ মন্টিকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া এজাহারে আরও ১১ জন এজাহারনামীয় আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাজাদা ওরফে সাজু গ্রুপের সক্রিয় সদস্য বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে। মামলার আসামিদের বিবরণ নিচে ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | আসামির নাম ও পদবি/পরিচিতি | এজাহারে উল্লেখিত বয়স |
| ১. | জিসান আহমেদ মন্টি (প্রধান আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী) | – |
| ২. | বাদশা ওরফে গুজা বাদশা | ৪৮ বছর |
| ৩. | গলদা বাদশা | ৪৫ বছর |
| ৪. | শান্ত ওরফে পিচ্চি শান্ত | ২৮ বছর |
| ৫. | সোলাইমান খন্দকার | ৪৫ বছর |
| ৬. | ফারুক ওরফে चाचा ফারুক | ৩৫ বছর |
| ৭. | হেবেল | ৩৫ বছর |
| ৮. | মোল্লা জনি | ৪২ বছর |
| ৯. | ফিরোজ মোহাম্মদ মোল্লা | ৪৫ বছর |
| ১০. | পিচ্চি আলামিন ওরফে তোতলা আলামিন | – |
| ১১. | সজীব | ৩৫ বছর |
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন ইমাম হোসেন ও মারুফসূলতান ওরফে ফেরদৌস (৩৭)। এর মধ্যে ইমাম হোসেনকে বাড্ডা এলাকা থেকে এবং মারুফ সুলতানকে হাতিরঝিল থানার উত্তর নয়াটোলা চেয়ারম্যান গলি এলাকা থেকে র্যাব-৩ ও পুলিশের যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ বিষয়ে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো-কে জানান, গ্রেপ্তারকৃত এই দুজনের নাম মূল এজাহারে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও প্রাথমিক তদন্তে এই হামলার ঘটনার সাথে তাঁদের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, যে মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করে দুর্বৃত্তরা এসে পলাশকে গুলি করেছিল, ইমাম হোসেন ছিলেন মূলত সেই মোটরসাইকেলটির চালক। অন্যদিকে, মারুফ সুলতান ঘটনার সময় ওই এলাকায় অত্যন্ত সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছিলেন এবং হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রেকি করার দায়িত্বে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার পর হামলার কাজে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল এবং একটি হেলমেট জব্দ করা হয়েছে। অপরাধজগতের পুরোনো আধিপত্য বিস্তার ও খিলগাঁও-রামপুরা এলাকার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।