খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষকের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিধিমালা করা হলেও, বিভিন্ন সংগঠনের বিরোধিতার মুখে মাত্র দুই মাসের মাথায় তা সংশোধন করে বাতিল করা হয়। ফলে এই দুই বিষয়ে আলাদা শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ থমকে যায়। তবে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করার সরকারি পরিকল্পনার কারণে সংগীতশিক্ষকের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি পুনরায় সামনে এসেছে। বর্তমান সরকার আপাতত শিক্ষক সংকটের বিকল্প হিসেবে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় গুচ্ছ বা ক্লাস্টার পদ্ধতিতে উপজেলাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ কিছু নতুন বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরের চতুর্থ শ্রেণিতে ‘কালচার’ (সংস্কৃতি) ও ‘স্পোর্টস’ (ক্রীড়া) নামে দুটি নতুন বিষয় যুক্ত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ (আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা) এবং ‘টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেasional এডুকেশন’ (কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা) নামে আরও দুটি নতুন বিষয় বাধ্যতামূলক করার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এই নতুন বিষয়গুলো চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলেই মূলত বিদ্যালয়ে পুনরায় দক্ষ সংগীতশিক্ষকের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষক না থাকায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগে কাজ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, দেশে পর্যাপ্ত সংগীতশিক্ষক না থাকায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীতশিক্ষকদের ক্লাস্টার বা গুচ্ছ আকারে উপজেলাপর্যায়ে কাজে লাগানো হবে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আরও স্পষ্ট করেন যে, মন্ত্রিসভায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীতশিক্ষক নিয়োগে ‘অসম্মতি’ দেওয়া হয়েছে বলে যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা সঠিক নয়; কারণ মন্ত্রিসভায় এ ধরনের কোনো আলোচনাই হয়নি। তিনি জানান, সরকার বর্তমানে সংগীত প্রতিযোগিতার পাশাপাশি কেরাত প্রতিযোগিতা, নৈতিকতা এবং পারিবারিক মূল্যবোধবিষয়ক কার্যক্রম নিয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্রমান্বয়ে সংস্কৃতি ও সংগীত বিভাগ চালু করা হচ্ছে, যেখান থেকে ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক পাওয়া সম্ভব হবে।
বর্তমানে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র ও শিক্ষক নিয়োগের পূর্ববর্তী প্রস্তাবনার তথ্য নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ ও সূচক | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় | ৬৫,০০০-এর বেশি |
| মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা | প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ |
| মোট শিক্ষকের সংখ্যা | পৌনে চার লাখের মতো |
| প্রাথমিক শিক্ষার স্তর | প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত |
| তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির মূল বিষয় | ৬টি (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, ধর্ম) |
| বিজ্ঞান কোটা (শিক্ষক নিয়োগে) | ২০ শতাংশ পদ বিজ্ঞান স্নাতক ডিগ্রিধারীদের জন্য সংরক্ষিত |
| ২০২৪ সালের অনুমোদিত মোট পদ | ৫,১৬৬টি (সংগীত: ২,৫৮৩টি, শারীরিক শিক্ষা: ২,৫৮৩টি) |
| সংগীতের জন্য নির্ধারিত গানের সংখ্যা | মোট ১৩টি গান (জাতীয় সংগীতসহ) |
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সংগীত বিষয়ে আলাদা কোনো নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তক নেই এবং এ বিষয়ে কোনো প্রথাগত পরীক্ষাও দিতে হয় না। তবে শিক্ষাবর্ষের শেষে শিক্ষকেরা একটি নির্দিষ্ট ‘শিক্ষক নির্দেশিকা’ অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করেন। নির্দেশিকা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত গানগুলো আত্মস্থ করতে পারলে তাদের মধ্যে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শ্রমের মর্যাদা ও বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হবে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির হার বৃদ্ধি পাবে এবং ঝরে পড়ার হার হ্রাস পাবে।
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রমে মোট ১৩টি গান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গানগুলো হলো—
১. ‘আমার সোনার বাংলা’ (জাতীয় সংগীত)
২. ‘এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল, মিঠা নদীর পানি’
৩. ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি বাংলাদেশের নাম’
৪. ‘আমরা করব জয়’
৫. ‘আল্লা মেঘ দে পানি দে’
৬. ‘প্রজাপতি, প্রজাপতি! কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা’
৭. ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’
৮. ‘নিজের হাতে কাজ কর’
৯. ‘চল চল চল’
১০. ‘প্রিয় ফুল শাপলা ফুল’
১১. ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’
১২. ‘আমরা সবাই রাজা’
১৩. ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’।
প্রাথমিক স্তরে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের কোনো নিয়ম নেই; সাধারণ শিক্ষকেরাই সব বিষয় পড়িয়ে থাকেন। শিক্ষকদের সংগীতের ওপর স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যাঁরা আগে কখনো গান শেখেননি, তাঁদের জন্য এই প্রশিক্ষণ কার্যকর হয় না। এই পরিস্থিতি দূর করতে ২০২০ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশেষায়িত শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২,৫৮৩ জন সংগীতশিক্ষক এবং ২,৫৮৩ জন শারীরিক শিক্ষা শিক্ষকসহ মোট ৫,১৬৬ জন শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাবে সম্মতি দেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২৮ আগস্ট তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫’-এর প্রজ্ঞাপন জারি করে, যেখানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পাশাপাশি ‘সহকারী শিক্ষক (সংগীত)’ ও ‘সহকারী শিক্ষক (শারীরিক শিক্ষা)’ পদের সৃষ্টি করা হয়েছিল। তবে প্রজ্ঞাপন জারির পর ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সংগীতশিক্ষকের পরিবর্তে ধর্মশিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়ে আন্দোলন ও আলটিমেটাম দেয়। ফলশ্রুতিতে, প্রজ্ঞাপন জারির দুই মাসের মাথায় বিধিমালা সংশোধন করে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের পদগুলো সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়। সংশোধিত বিধিমালায় কেবল প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ বহাল রাখা হয়, যার বিরুদ্ধে পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন বিক্ষোভ ও সমাবেশ প্রদর্শন করে। বর্তমানে এই শূন্যতা পূরণে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ক্লাস্টার পদ্ধতিই সরকারের একমাত্র ভরসা।