খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) বাবুল চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) এবং কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) প্রকল্প থেকে ১৫ শতাংশ হারে ঘুষ নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য ও প্রকল্প সভাপতিদের কাছে ক্যালকুলেটরে হিসাব কষে সুনির্দিষ্ট অংকের এই ঘুষের অর্থ দাবি করার একটি ভিডিওচিত্র সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ৪ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডের ওই ভিডিওচিত্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর তা দ্রুত ভাইরাল হয় এবং বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনসহ সর্বস্তরে ব্যাপক আলোড়ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র রায় তাঁর নিজস্ব কার্যালয়ে দাপ্তরিক নথিপত্র নিয়ে নিজ আসনে বসে আছেন। তাঁর সামনে বেশ কয়েকজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও প্রকল্পের সভাপতি অবস্থান করছেন এবং তিনি তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন। তবে ভিডিওচিত্রটির ধারণ কৌশল এমন ছিল যে, কথোপকথনের সময় পিআইও বাবুল চন্দ্র রায়ের সামনে উপবিষ্ট ব্যক্তিদের অবয়ব বা চেহারা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না।
ভিডিওচিত্রের কথোপকথন থেকে জানা যায়, আলোচনার একপর্যায়ে পিআইও বাবুল চন্দ্র রায় সামনে থাকা এক জনপ্রতিনিধিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ওই মেম্বার সাহেব, আপনার ৮ টন গম না? ৪০ করে।’ এই বক্তব্যের জবাবে তাঁর সামনে থাকা ব্যক্তিটি সংশোধন করে বলেন, ‘না স্যার, ৩২ হাজার করে।’ এর পরপরই সরকারি এই কর্মকর্তা নিজের সামনে থাকা ক্যালকুলেটর চেপে হিসাব কষতে শুরু করেন। হিসাব শেষে তিনি বলেন, ‘তাহলে ৩২ ইন্টু ৮, ২ লাখ ৫৬ হাজার, ইন্টু ১৫ পারসেন্ট যদি দেন, ৩৮ হাজার টাকা আসে।’ পিআইওর মুখে এই অংকের কথা শুনে সামনে থাকা ব্যক্তিটি অনুনয় করে বলেন, ‘এত স্যার! একটু কম করে নেন। ৩৮ হাজার টাকা স্যার কাজের তো লাভও হয়নি।’
জবাবে পিআইও বাবুল চন্দ্র রায় মন্তব্য করেন, ‘মেম্বারদের কোনো দিন লাভ হয় না।’ তখন ওই ইউপি সদস্য তাঁর কাজের মান উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার কাজটা আপনি দেখেননি স্যার? কী কাজ করছি।’ পিআইও তখন প্রত্যুত্তরে বলেন, ‘এটা কোনো দিন শুনছেন মেম্বাররা বলছে আমার লাভ হইছে, আপনারা বলেন। আমি যে এত দিন পিআইওগিরি করতেছি। আমাক কোনো মেম্বার বলে নাই যে আমার লাভ হইছে।’ সামনে থাকা ব্যক্তি তখন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘কামের (কাজের) তো চাপ স্যার দলীয়ভাবে, জনগণও চায় কাজ একটু ভালো হোক।’ তখন পিআইও দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘আমার কথা আমি বলছি, এখন আপনার কোনো কথা থাকলে বলেন।’
ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত অন্য একজন ব্যক্তি বলে ওঠেন, ‘এই চাচার একটা টিআর আছে।’ অপর এক ব্যক্তি যোগ করে বলেন, ‘স্যার, আমার একটা টিআর আছে সামান্য।’ পিআইও তখন জানতে চান, ‘কত?’ ওই ব্যক্তি টাকার পরিমাণ উল্লেখ করে বলেন, ‘১ লাখ ৬২ হাজার।’ এই তথ্য পাওয়ার পর পিআইও বাবুল চন্দ্র রায় পুনরায় তাঁর টেবিলের ক্যালকুলেটর চেপে হিসাব করতে শুরু করেন। হিসাব কষে তিনি বলেন, ‘তাহলে ১ লাখ ৬২ ইন্টু ১৫ পারসেন্ট, ২৪ হাজার।’
কমিশনের এই বিশাল অংক শুনে ভুক্তভোগী ব্যক্তিটি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘২৪ হাজার স্যার! আমরা তো সাড়ে তিন বছর পরিষদেই আসিনি। কাজ তো আমরা হান্ড্রেড পারসেন্ট করি, স্যার।’ এর জবাবে পিআইও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শোধবোধের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘শুনেন, আপনাদের আগে পরিষদে আসতে দেয় নাই, এর পর থেকে আপনারাও এখন আসতে দেবেন না, শোধবোধ।’ এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ওই ব্যক্তি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘শোধবোধ কেমনে হইল স্যার? আমরা আছি দেড় বছর, পাঁচ বছর তো আর নয়া করে ফিরে আসবে না, সাড়ে তিন বছর গেছে আর দেড়টা বছর।’ এরপর পুনরায় ক্যালকুলেটর চেপে উপস্থিত দুজনের টিআর প্রকল্প থেকে মোট কত টাকা কমিশন বা ঘুষ আসবে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হিসাব করতে দেখা যায় পিআইও বাবুল চন্দ্র রায়কে।
উক্ত ঘটনার দিন দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা একজন ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন ওই কার্যালয়ে প্রায় আট থেকে দশ জন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তবে তাঁদের মধ্যে ঠিক কে বা কারা এই ভিডিওটি ধারণ করেছেন, তা তিনি বুঝতে পারেননি। তাঁর ভাষ্যমতে, ঘটনাটি ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়ানোর প্রায় ছয় থেকে সাত দিন আগের। তিনি নিজে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি সরকারি প্রকল্পের কাজ করেছিলেন এবং পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই সেই কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। কাজ শতভাগ বুঝে নেওয়ার পরেও পিআইও বিল না দিয়ে শুধু ঘোরাচ্ছিলেন। পরবর্তীতে বিল পেলেও ১৫ শতাংশ ঘুষের বিষয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ওনাকে ১৫ শতাংশ দিলে টাকা কোথায় পাবেন? তবে তিনি জানান, পিআইও সবার কাছ থেকে এক হারে টাকা নেন না; কারও কাছ থেকে ৫ শতাংশ আবার কারও কাছ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত আদায় করেছেন।
ভিডিওর বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র রায়ের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগটি অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ‘আসলে আমরা অনেক সময় ইউপি সদস্য ও প্রকল্প সভাপতিদের ভ্যাট-আইটি, মিস্ত্রি খরচসহ বিভিন্ন হিসাব করে দিই। অনেক সময় কেউ কেউ কাজ না করেই এখানে এসে ধরনা ধরেন। কোন সময় কে কীভাবে যে এমন ভিডিও করে ছেড়ে দিয়েছে, এটা তো আমি अवगत নই। আপনারা আমার বিষয়ে তদন্ত করে দেখেন, আমি কারও কাছে এভাবে ঘুষ চাই কি না।’
এই স্পর্শকাতর দুর্নীতির বিষয়ে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন মুঠোফোনে জানান, ভিডিওচিত্রটি প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সেই অনুযায়ী উক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।