খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল জোনে লোকসান কাটাতে এবং রাজস্ব আয় বাড়াতে আরও ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ট্রেনগুলো বেসরকারি অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে রেলওয়ের প্রধান কার্যালয় বা সদর দপ্তরে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের আশা, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি রেলের আর্থিক ঘাটতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এই জোনে মোট ১৩৫টি ট্রেন চলাচল করছে। এর মধ্যে রয়েছে ৬টি আন্তর্জাতিক ট্রেন, ৬২টি আন্তনগর, ৫৫টি মেইল ও কমিউটার ট্রেন এবং ১২টি লোকাল ট্রেন। এই বিশাল সংখ্যক ট্রেনের মধ্যে ইতিমধ্যেই ২৪টি মেইল, কমিউটার ও লোকাল ট্রেন বেসরকারি অপারেটরদের কাছে ইজারা দেওয়া আছে। রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, লোকাল ও কমিউটার ট্রেনগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালাতে গিয়ে আয়ের চেয়ে ব্যয় অনেক বেশি হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের এই লোকসানি অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, ইজারা দেওয়া ট্রেনগুলো থেকে সমস্ত খরচ বাদ দেওয়ার পরও প্রতি মাসে রেলওয়ের প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা নিট আয় হচ্ছে। এই সফলতার ওপর ভিত্তি করেই নতুন করে আরও ১১টি ট্রেন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে ধারাবাহিকভাবে তাদের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশাল সংখ্যক যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করার পরেও আয়ের খাতটি আশানুরূপ শক্তিশালী করা যাচ্ছে না। বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেলের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে আয় হয়েছে মাত্র ৬৪৯ কোটি টাকা। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়ে ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা করা হলেও আয় উল্টো কমে দাঁড়ায় ৬২১ কোটি টাকায়। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) ৮২৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৫৬৬ কোটি টাকা।
রেলওয়ের এই ধারাবাহিক আর্থিক সংকটের পেছনে মূল কারণ হিসেবে জনবল সংকট এবং টিকিটবিহীন যাত্রী চলাচলকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পশ্চিমাঞ্চল রেলের অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক আনসার আলী এই বিষয়ে জানান, রেলের এই জোনে তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। সংকট দূর করতে যদি নতুন করে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে রেলের পরিচালন ব্যয় আরও অনেক বেড়ে যাবে, যা বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রেলের জন্য বড় বোঝা হবে। তাছাড়া লোকাল ট্রেনের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো, যাত্রীদের অনেকেই টিকিট কিনতে চান না বা ফাঁকি দিয়ে যাতায়াত করেন। ফলে এসব রুট থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আসে না। এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই ইজারার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় টিকিট চেকিং ও রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা যায়।
একই সুর শোনা গেছে পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক আহসান উল্লাহ ভূঁইয়ার কণ্ঠেও। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রতিটি মেইল বা লোকাল ট্রেনে শতভাগ টিকিট পরীক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। আর এই সুযোগে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। তবে নির্দিষ্ট কোনো ট্রেনের লোকসানের সঠিক পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিটি মেইল বা লোকাল ট্রেনের বার্ষিক লোকসানের আলাদা কোনো হিসাব রাখা হয় না। সব ট্রেনের সামগ্রিক আয় ও ব্যয়ের হিসাব একটি সম্মিলিত ব্যবস্থার মাধ্যমে তৈরি করা হয়। তবে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়লে সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নিচে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত আয়ের একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | অর্থবছর | রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা (কোটি টাকায়) | প্রকৃত আয় (কোটি টাকায়) | আয়ের ঘাটতি (কোটি টাকায়) |
| ১ | ২০২৩-২৪ | ১,০৭৭ | ৬৪৯ | ৪২৮ |
| ২ | ২০২৪-২৫ | ১,১৬০ | ৬২১ | ৫৩৯ |
| ৩ | ২০২৫-২৬ (১০ মাস) | ৮২৫ | ৫৬৬ | ২৫৯ |