খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
বিশ্ব ক্রিকেটের মঞ্চে একসময় পাকিস্তান দলের ছিল দোর্দণ্ড প্রতাপ। ইমরান খানের মতো দূরদর্শী অধিনায়ক কিংবা জাভেদ মিয়াঁদাদ, সাঈদ আনোয়ার ও ইনজামাম-উল-হকের মতো বিশ্বমানের ব্যাটাররা প্রতিপক্ষের বোলারদের মনে ভয় ধরাতেন। বল হাতে শোয়েব আখতার, ওয়াসিম আকরাম আর ওয়াকার ইউনুসের গতির ঝড় তো ছিল ক্রিকেট ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। কিন্তু সেই সোনালী দিন এখন শুধুই অতীত। পাকিস্তান ক্রিকেটের সেই গৌরবোজ্জ্বল সূর্য যেন এখন অস্তগামী। অনেক দিন হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বলার মতো কোনো বড় সাফল্য নেই তাদের।
পুরুষ দলের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার অন্ধকার ছায়া এবার গ্রাস করেছে দেশের নারী ক্রিকেট দলকেও। মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে সংবাদ শিরোনাম হওয়ার বদলে একের পর এক বিতর্ক আর অভ্যন্তরীণ কোন্দলই এখন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। ইংল্যান্ডের মাটিতে চলমান নারী টি-২০ বিশ্বকাপে নিজেদের মেলে ধরতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে দলটি। এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে কোনো জয়ের মুখ দেখেনি তারা। অবশ্য বিশ্বকাপের আগেও আয়ারল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়েও একই রকম জয়ের খরায় ভুগেছে পাকিস্তান। এই টানা ব্যর্থতার আবহেই এবার দলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো চরম শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অন্তর্দ্বন্দ্বের বিস্ফোরক খবর।
বিতর্কের সূত্রপাত দলের অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার আলিয়া রিয়াজকে কেন্দ্র করে। গত শনিবার বাংলাদেশের বিপক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগে আলিয়া রিয়াজ হোটেল রুমে তাঁর স্বামী আলী ইউনুসকে নিয়ে আসেন। ম্যাচের ঠিক আগের দিন দলের অন্যতম সিনিয়র সদস্যের রুমে বহিরাগত পুরুষ দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তরুণ অধিনায়ক ফাতিমা সানা। তিনি অবিলম্বে আলী ইউনুসকে রুম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু অধিনায়ককে তোয়াক্কা না করে আলিয়া রিয়াজ উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখান। অধিনায়কের ক্ষোভকে পাত্তাই দেননি তিনি। এমনকি ম্যাচের আগের দিন দলের নির্ধারিত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন সেশন ফাঁকি দিয়ে স্বামীকে নিয়ে শহর ঘুরে বেড়াতে বেরিয়ে যান আলিয়া।
আলিয়ার এমন অপেশাদার ও শৃঙ্খলাহীন আচরণ অধিনায়ক ফাতিমাকে আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তোলে। দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে তিনি বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে আলিয়াকে একাদশের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এখানেই তৈরি হয় নতুন জটিলতা। অধিনায়ক ফাতিমার সেই স্পষ্ট পরামর্শ ও সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখান দলের প্রধান কোচ। ফাতিমার আপত্তি উপেক্ষা করে কোচ আলিয়া রিয়াজকে রেখেই ম্যাচের চূড়ান্ত একাদশ ঘোষণা করেন। টিম ম্যানেজমেন্টের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে মাঠের খেলায়। চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশের কাছে ২৩ রানের বড় ব্যবধানে হেরে যায় পাকিস্তান। আলিয়া রিয়াজ নিজেও ব্যাট হাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হন, সাজঘরে ফেরেন কোনো রান না করেই।
এই লজ্জাজনক পরাজয়ের পর দলের ড্রেসিংরুমের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক ফাতিমা সানা সবার সামনে এই হারের জন্য সরাসরি কোচকে দায়ী করে রাগে ফেটে পড়েন। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, কোচ নিজে দলের শৃঙ্খলা ও প্রটোকল ভেঙেছেন, যার খেসারত দিতে হয়েছে পুরো দলকে। এই ঘটনার পর দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে যেমন উপদল তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি কোচের সঙ্গেও ক্রিকেটারদের বহুমুখী দ্বন্দ্ব এখন পুরোপুরি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। অবশ্য কোচ এই ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নিতে নারাজ। তিনি উল্টো সব দোষ চাপিয়েছেন ক্রিকেটারদের ওপর। তাঁর দাবি, ক্রিকেটাররা মাঠে কোচের দেওয়া পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন না বলেই দল বারবার হারছে।
দল নির্বাচন এবং শৃঙ্খলা নিয়ে অধিনায়কের সঙ্গে শুধু কোচই নন, বরং দলের মেন্টর ওয়াহাব রিয়াজেরও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) অবশ্য দলের ভেতরের এই চরম অস্থিতিশীলতা ও অন্তর্কোন্দলের খবর নিয়ে এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তারা বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার—কোনোটাই না করে নীরব ভূমিকা পালন করছে। তবে ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, গত ৩-৪ বছর ধরে একের পর এক কোচ ও ম্যানেজমেন্ট পরিবর্তন করেও পাকিস্তান নারী ক্রিকেটের এই কাঠামোগত ধস ও শৃঙ্খলাহীনতা কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না।