খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১২ মার্চ ২০২৫
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি মনে করেন শুল্ক একটি কার্যকরী সমাধান। একটি সর্বজনীন অর্থনৈতিক উপকরণ যা, আমেরিকার উৎপাদন ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে, গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে বিদেশী দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে, বাণিজ্যের ভারসাম্য পুনঃস্থাপন করতে এবং প্রচুর পরিমাণে টাকা আয় করতে সহায়তা করবে; যা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি মেটাতে এবং আমেরিকানদের করের বোঝা কমাতে সাহায্য করবে।
কিন্তু, কথায় আছে, ‘যদি কিছু খুব ভালো মনে হয়, তবে তা সাধারণত সত্যি নয়।’
ট্রাম্পের পরিকল্পনার সমস্যা হল, শুল্ক সব লক্ষ্য একসাথে পূরণ করতে সক্ষম নয়। কারণ ট্রাম্পের লক্ষ্যগুলো অনেক সময় পরস্পরবিরোধী।
যেমন, যদি শুল্ক চাপ সৃষ্টি করার একটি কৌশল হয়, তবে তা ওইসব দেশগুলো তাদের শর্ত মেনে নেওয়ার পর তুলে নিতে হবে – যার মানে হচ্ছে বাণিজ্যের ভারসাম্য পুনঃস্থাপনের জন্য শুল্ক আর থাকবে না। যদি শুল্ক আমেরিকার উৎপাদন খাতকে উৎসাহিত করার জন্য তৈরি হয়, তবে তা ঘাটতি পূরণের জন্য রাজস্ব বাড়াতে সহায়তা করতে পারে না – যদি আমেরিকানরা আমেরিকায় তৈরি পণ্য কিনতে শুরু করে, তবে বিদেশি পণ্যের উপর শুল্কের দায়িত্ব কে নিবে?
এবং ট্রাম্পের শুল্ক পরিকল্পনা হয়তো আমেরিকার অর্থনীতির জন্য বেশি ক্ষতি করতে পারে, সাহায্য নয়। ট্রাম্প সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে শুল্ক ‘বিশৃঙ্খলা’ সৃষ্টি করবে। এবং সোমবার (১০ মার্চ) শেয়ারবাজার পড়ে যায়, যখন ট্রাম্প তার বাণিজ্য নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র মন্দার মধ্যে পড়বে না বলে পূর্বাভাস দিতে অস্বীকার করেন।
কিন্তু ট্রাম্প মনে হচ্ছে শুল্কের প্রতি সত্যিকারের বিশ্বাসী। তিনি প্রায়ই প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলি’র প্রশংসা করেন, যিনি ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে আমেরিকায় আয়কর চালু হওয়ার আগে বিদেশি দেশগুলোর উপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করেছিলেন। ট্রাম্প প্রায়ই বলেছেন যে শুল্ক ‘একটি সুন্দর শব্দ’ যা আবার আমেরিকাকে ধনী করে তুলবে।
বারবার স্থগিত এবং পিছু হটার পরেও, ট্রাম্প মনে হচ্ছে ২ এপ্রিল থেকে বিদেশি তৈরি পণ্যের উপর বিশাল শুল্ক আরোপ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ – বিভিন্ন কারণে।
ফেন্টানাইল এবং অভিবাসন
ট্রাম্প বলেছেন যে, তিনি চীনকে আরোপিত ২০% শুল্ক এবং মেক্সিকো ও কানাডার উপর ২৫% শুল্ক – যেগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থগিত করা হয়েছে। এই শুল্কগুলি ওই দেশগুলিকে চাপ দেওয়ার জন্য আরোপ করেছেন, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইল এবং অবৈধ অভিবাসন প্রবাহ বন্ধ করতে পারে।
রবিবার (৯ মার্চ) এনবিসি নিউজের “মিট দ্য প্রেস”-এ বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক বারবার বলেছেন, “স্থগিত শুল্কগুলো, যেগুলি এখন আগামী ২ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা, সেই শুল্কগুলো তখনই থাকবে যতক্ষণ না ট্রাম্প মনে করেন, ওই দেশগুলো ফেন্টানাইল প্রবাহ বন্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করেছে। যদি ফেন্টানাইল বন্ধ হয়ে যায়, তবে আমি মনে করি এই শুল্ক তুলে নেওয়া হবে। কিন্তু যদি ফেন্টানাইল বন্ধ না হয় বা তিনি এর ব্যাপারে অনিশ্চিত থাকেন, তবে সেগুলো এমনভাবেই থাকবে যতক্ষণ না তিনি আরামদায়ক বোধ করেন। এটা সাদা-কালো বিষয়। আপনাকে আমেরিকান জীবন রক্ষা করতে হবে।’
মেক্সিকো ও কানাডার উপর ট্রাম্পের শুল্ক ‘একটি মাদক যুদ্ধে, একটি বাণিজ্য যুদ্ধ নয়’-বলে রবিবার এনবিসি নিউজের “দিস উইক”-এ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের পরিচালক কেভিন হাসেট উল্লেখ করেছেন।
রাজস্ব আয় বৃদ্ধি
ট্রাম্প শুল্ক আরোপ থেকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কাল্পনিক এক হিসাব দিয়েছেন।
গত সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা কোটি কোটি ডলার আয় করতে পারব এবং এত বেশি কাজের সুযোগ তৈরি হবে, যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। আমেরিকাকে আবার ধনী এবং আমেরিকাকে আবার মহান করতেই এই শুল্ক।’
গত রবিবার ট্রাম্প তাঁর এয়ারফোর্স ওয়ানে বসে বলেন, ‘আমরা এতটা ধনী হতে চলেছি যে আপনি বুঝে উঠতে পারবেন না, কোথায় এত অর্থ খরচ করবেন।’
রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের একটি কমিটি তাদের পরিসংখ্যানে বলেছে, ট্রাম্প চীন, মেক্সিকো ও কানাডার ওপর যে শুল্ক আরোপ করতে চলেছেন, তাতে বছরে ১২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার আয় হবে। ১০ বছরে ওই আয় গিয়ে দাঁড়াবে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
কিন্তু সমস্যা হলো, এত দীর্ঘ সময়ের জন্য এই শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা সাজানো হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, ফেন্টানিল আসা বন্ধ হলে তারা ‘সফল’। তাই যদি হয় তবে বলাই যায়, এক দশক ধরে এই শুল্ক থাকবে না।
হ্যাসেট বলেছেন, ফেন্টানিল নিয়ে কাজ শুরুর কারণেই ট্রাম্প কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর শুল্ক কার্যকর হওয়া দুই দফা পিছিয়েছেন।
উৎপাদন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ
এয়ার ফোর্স ওয়ানে বসে রবিবার ট্রাম্প আরও বলেছেন, ‘আমি আপনাকে বলছি, আপনি শুধু দেখে যান। আমাদের নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হতে চলেছে, আমরা কারখানা খুলতে চলেছি। এটা দারুণ কিছু হতে চলেছে।’
ট্রাম্প মাঝেমধ্যেই দেশে তৈরি পণ্যের ওপর কম কর এবং বিদেশে উৎপাদিত পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর পক্ষে কথা বলেন।
কংগ্রেসের উভয় কক্ষে যৌথ ভাষণের সময় ট্রাম্প শুল্কের পক্ষে তাঁর মূল যুক্তিগুলোর একটির কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশজ উৎপাদন ও সব উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর কর কমাতে চাই। যদি আপনি আপনার পণ্য আমেরিকায় উৎপাদন না করেন, তবে আপনাকে শুল্ক দিতে হবে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি পরিমাণে।’
এটা অনেকটা লাঠিতে মুলা ঝোলানোর মতো বাণিজ্যনীতি। যেখানে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাত পুনরুদ্ধার করার কথা বলছেন। যদি কোম্পানিগুলো ট্রাম্পের পরামর্শ মেনে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য উৎপাদন শুরু করে, তবে ট্রাম্পের কথা অনুযায়ী তাদের আর শুল্ক দিতে হবে না। সে ক্ষেত্রে শুল্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আয়ও বাড়বে না।
ঋণ পরিশোধ এবং কর হ্রাস
দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্প শুরুতেই যেসব ব্যবস্থা নিয়েছেন, তার মধ্যে একটি হলো দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেশের বাইরে থেকে রাজস্ব আয়ের (এক্সটার্নাল রেভিনিউ সার্ভিস) উপায় খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধ ও কর হ্রাস করতে চান।
সমস্যা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের করদাতারা প্রতিবছর তিন ট্রিলিয়ন ডলার আয়কর দেন এবং প্রতিবছর প্রায় তিন ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র। এর অর্থ আয়কর থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করে, ট্রাম্প যদি সেটা শুল্ক থেকে আয় করতে চান, তাহলে তাঁকে অন্তত ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে হবে। এই পরিমাণ শুল্ক আরোপ প্রায় অসম্ভব। কারণ, তাতে আমেরিকার বাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাবে।
এমনটা যে হবে না, সেটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। তার ওপর, পণ্যের দাম বেড়ে গেলে ভোক্তারা তাদের ব্যয় কমিয়ে দেবেন, এতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাণিজ্যের ন্যায্যতা পুনরুদ্ধার
কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ভাষণের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘দশকের পর দশক ধরে বিশ্বের প্রায় সব দেশ আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে গেছে এবং আমরা আর এটা হতে দেব না। অন্যান্য দেশ দশকের পর দশক ধরে আমাদের বিরুদ্ধে শুল্ককে ব্যবহার করে গেছে। এবং এখন অন্য দেশের বিরুদ্ধে আমাদের সেগুলো ব্যবহারের পালা।’
বাণিজ্যে ন্যায্যতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের বহু পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের কথা বলেছেন। আগামী ২ এপ্রিল থেকে ওই শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে যখন বেশি শুল্ক দিতে হয় এবং বাণিজ্য ভারসাম্যহীন হয়, ট্রাম্প প্রায়ই এ ধরনের পরিস্থিতিকে ভুলভাবে ‘ভর্তুকি’ বা ‘লোকসান’ বলে বর্ণনা করেন।
অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বাণিজ্য ঘাটতি মানে লোকসান বা ভর্তুকি নয়। বরং এমনকি ঘাটতি শক্তিশালী অর্থনীতির একটি প্রতিফলক।
অর্থনীদিবিদেরা মনে করেন, অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি অর্থপূর্ণভাবে কমাতে শুল্কারোপ সম্ভাব্য উপায় নয়।
যদি তা হয়, তবে এটি এমন একটি সংকেত হতে পারে যে আমেরিকার খরচের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
সূত্র: সিএনএন
খবরওয়ালা/আরডি