জি এম কিবরিয়া
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ মার্চ ২০২৫
সুবহে সাদিকের স্নিগ্ধ আভা ঢাকার নিচতলার ঘিঞ্জি মেসে চুপিসারে নেমে এসে চুমে যাবে রহিমুদ্দির কর্কশ গাল, তা অবাস্তব। রহিম তা জানে। ঈদে বাড়ি ফিরতে ব্যাকুল রহিম বেশ অস্থির! আজান কখন হয়! সবকিছু নিছি তো! অবশেষে ভেসে আসে ‘আসসালাতু খাইরুমমিনান নাউম’। চনমনে হয়ে ওঠে তার মনপ্রাণ! কে আটকায় তাকে? পলিথিনে মোড়ানো পোঁটলা হাতে হনহন বেরিয়ে পড়ে রাস্তায় সে।
‘শালার এই চতুর ঢাহায় আমার চেয়ে দেহি সব শালাই বেশি চতুর! এই কাউয়াডাকা ভোরে রাস্তায় এতলা মানু!’ বিড়বিড় করে রহিম।
রহিমের কপালে ভাঁজ! রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। শুধু যাত্রী আর যাত্রী! সকলের চোখেমুখে অস্থিরতা! হঠাৎ ছালহীন কুকুরের মতো একটি বাস এসে হাঁকে ‘বিশনন্দী ফেরিঘাট তিন শ, বিশনন্দী তিন শ, ফেরিঘাট তিন শ!’ পঙ্গপালের মতো বাসের দিকে ধেয়ে আসে আদম সন্তান। রহিমুদ্দি কোনো রকমে বাসের হ্যান্ডেল ধরে ফেলে। হ্যান্ডেল ধরা মানেই চিকনে ঢুকে সিট কনফার্ম। গার্মেন্টসের চাকরি তাকে এই বিদ্যায় পটু করেছে ঢের।
তেল-চিটচিটে বাসের সিটে হাত বোলায় রহিম! যেন মেসের তেল-চিটচিটে বিছানা! আহ্! কী শান্তি! শান্তির পরশে নিজের বিছানা মনে করে আয়েশে দুচোখ বোজে রহিম ! যেন সে রাজহাঁসের পাখায় ভেসে ভেসে বাড়ি যাচ্ছে! বাতাসের ঝাপটায় চুল ওড়ে। একেবারে ফুরফুরা। আনন্দবানে অন্তরে বেজে ওঠে, ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার’।
‘টিফিনক্যারি হাতে নিত্য ছুটে চলা সকল গার্মেন্টস শ্রমিক কি আজ মুক্ত? আমার মতো! সবাই কি আজ উড়ন্ত বলাকা?’ রহিম ভাবে।
হেলপারের ‘ফেরিঘাট নামেন, ফেরিঘাট’ হাঁকে তন্দ্রা কাটে রহিমের!
‘ফেরিঘাট তো মেলা বাকি,’ বিরক্তি নিয়ে বলে রহিম! ‘অই মিয়া, নামেন! চোখ কি খাইছেন নাকি? দেহেন না, জ্যাম!’ হেলপারের কর্কশ ধমকে রহিমের আনন্দে ছাই পড়ে! মুহূর্তেই উড়ন্ত ধবল বলাকা যেন ধপাস করে মাটিতে পড়ে! একটু ঢোঁক গিলে রহিম! গলা দিয়ে একটা তেতো ভাব নামে তার পেট পর্যন্ত! কপালে রাজ্যের বিরক্তিরেখা টেনে ঘাট থেকে দেড় মাইল দূরে নামতে বাধ্য হয় সে। কপালের ওপর হাত দিয়ে সূর্যকে আড়াল করে জ্যাম ঠেলে এগিয়ে যায় রহিমুদ্দির ঈদযাত্রা।
বেলা মাথার ওপরে ওঠে! চৈত্রের গনগনে সূর্য, ইটে ঢেকে রাখা সাদা ঘাসের ন্যায় এই গার্মেন্টস কর্মী রহিমকে যেন আজ পেয়ে বসেছে!
দলে দলে ত্যক্তবিরক্ত মানুষকে দেখে কমপেয়ার করে সে, কার তেজ বেশি? সূর্যের? নাকি ওই ঈদ গমনেচ্ছু জনতার?’
একসময় সূর্যের তেজ জনতার তেজের কাছে পরাভূত হয়! তীব্র দাবদাহে অতিষ্ঠ এবং যানজটে বিরক্ত জনতা একসময় অসহিষ্ণু হয়। তারা তীব্র যানজট ও ফেরির অব্যবস্থাপনার দায় একে অপরকে দিয়ে চিৎকার করে তেড়ে আসে অটোচালক ও সিএনজিচালকেরা। একজন বলে, ‘শালা, তোর কারণে জ্যাম লাগছে!’ অপরজন ঘুষি মারে নাকে। বলে, ‘শালার পুত, তুই ডাইনে আইলি কেন?’ প্রথমজন একটানে ঘামে ভেজা শার্ট ছেত করে ছিঁড়ে ফেলে। গর্জে ওঠে সে, ‘বাইনচোদ, আমার বাড়ি কড়ইকান্দি, তোরে পুঁইত্তা ফালামু।’
এভাবে লোক জড়ো হয়ে আলি আলি রবে দুইটি পক্ষ যুদ্ধে নেমে পড়ে! কারও গেঞ্জি ছিঁড়ে, কারোর ঠোঁট ফাটে, কারও হাত ভাঙে, মুখে রক্ত ঝরে, কারোর গাড়ির গ্লাস ভাঙে, কয়েকটি সিএনজি উল্টে যায়!
এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় যানজট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়! রহিমুদ্দি হতভম্ব হয়ে ঘাটে বসে থাকে! দেখে, ফেরি ঘাটে ভিড়েছে ঠিকই, কিন্তু তীব্র জ্যামে গাড়ি খালাস করতে না পেরে ফেরিটি ঠায় দাঁড়িয়ে আছে! ডান পাশের রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ! মুখোমুখি বসে আছে গাড়ির সারি!
পানে পানি ছিটিয়ে পান দোকানি তোতা মিয়া দাড়িতে হাত বোলায়। চোখে তার তৃপ্তির হাসি। হঠাৎ হাঁক দেয়, ‘হালার লাগছে গ্যাঞ্জাম। যত গ্যাঞ্জাম, তত জ্যাম।’ তত বিক্রি কথাটা না বললেও আজকে দিনটি যে তোতা মিয়াদের, তা ক্লিয়ার। তারা দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছে! বিশনন্দী ফেরিঘাটের দোকানি ও হকারদের আজ পোয়াবারো! ‘এই ঝালমুড়ি, আ-চা-র, চানাচু-র-র কিংবা চায়ের কাপের টুংটাংয়ে ও মানুষের রঙে মজেছে রহিমুদ্দি! গার্মেন্টসের সেই সুইং মেশিনের আওয়াজ, আর ফোরম্যানের তাগাদা তো নেই। মেঘনার মুক্ত বাতাসের মতো আজ সে-ও মুক্ত।
পরক্ষণেই একটি দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে তার বুকের গভীর থেকে, ‘হালার এত খাটুনি করি, কিন্তু বেতনের বেলা ওই তিন হাজার! দশ হাজার রোজগারের নেশায় অভারটাইম খাটি! সূর্য কখন ওঠে আর কখন ডোবে! হায় রে গরিব মানুষ! গরিবের মধ্যেও যেন আমরাই সবচেয়ে গরিব ‘ ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে ঝালমুড়িওয়ালার তৃপ্ত চোখ ও হাস্যোজ্জ্বল মুখে কী যেন খোঁজে রহিমুদ্দি।
‘হ ব্যবসা! ব্যবসায়ে বরকত, রসুল কইসে। ব্যবসায়েই উন্নতি। চাকরির গোষ্ঠী কিলাই।” রহিম ভাবে।
ভিড় ঠেলে মেঘনার শীতল জলে চোখেমুখে ঝাপটা দিয়ে একটি গাছের ছায়ায় বসে পড়ে সে। তার মানসপটে ভেসে আসে ছায়াসুনিবিড় শান্ত স্নিগ্ধ সবুজ গ্রামটি! সে বেড়াচ্ছে গাঁয়ের কাদামাটির আলপথ ধরে। যে পথটি নৌকোঘাট থেকে এঁকেবেঁকে চলে গেছে বড় রাস্তা পর্যন্ত!
রহিমুদ্দি যখন গায়ে ফিরল, তখন সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। ‘কী ব্যপার! গাঁয়ের পথটি পাকা হয়ে গেছে? কী আশ্চর্য!’ রহিম ভাবে। কাকচক্ষুর মতো টলটলে শান্ত দিঘির জল এখন তলানিতে। সাদা-খয়েরি হাঁসের দল ভেসে আছে তারই বুকে। রহিমুদ্দি এবার হারায় শৈশবে। দূর থেকে ভেসে আসে তার দল বেঁধে ডুবসাঁতারের কল্লোল! চৈতন্য ফিরলে আবার আশ্চর্য হয় রহিম। গাঁয়ের রাস্তাঘাটে কোনো একটি ছেলেপেলের দেখা নেই! কোনো দৌড়াদৌড়ি নেই?’
বাড়ি ফিরে উঠোনের কোণে ডাকে রহিম, ‘মা!’ মুহূর্তেই একটি আলিঙ্গনে পথের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। মায়ের বুকে হারিয়ে যায় সেই ছোট্ট শিশুটি হয়ে! ঘেমে ভিজে চুপচুপে রহিমকে জড়িয়ে ধরে মা বলে, ‘আইছোত, বাজান? পথে কোনু সমস্যা অয় নাই তো?’
রহিম বলে, ‘না, মা!’ কিছুক্ষণ বাদে আবার বলে, ‘আমি না বড় অইছি, মা? তুমি খালি খালি চিন্তা করো!’
ঝলমলে বিকেলে রোজা মুখে গায়ের পথে বেরিয়ে পড়ে রহিমুদ্দি। পথঘাট, মানুষের বাড়িঘর কিংবা চালচলন, কথাবার্তা—সবকিছুর পরিবর্তন তার চোখে পড়ে। কিন্তু মায়ের সেই ঘ্রাণ, পরম মমতা আর তাদের গরিবি হাল আছে সেই আগের মতোই!
পথে মুরব্বিদের আদাব-সালাম দেয় রহিম! তারাও তার চাকরির খবর নেয়! কিন্তু তাজ্জবের বিষয় হলো, তরুণদের কেউ রহিমকে জিজ্ঞেস করে না! যেন অচেনা গাঁয়ের নতুন কোন অতিথি এসেছে এই গাঁয়ে।
একদল তরুণকে দেখে রহিমের চোখ ছানাবড়া! এগিয়ে গিয়ে লক্ষ করে, ‘সবার হাতে স্মার্টফোন! চুলে নাইজেরিয়ান কাটিং, হাতে লোহা কিংবা প্লাস্টিকের বালা, কারোর চোখা প্যান্ট ছেচড়িয়ে নিচে নেমে জাঙ্গিয়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে! ছি! ‘তবে কি এটাই আজকের স্টাইল? নাকি বেহায়াপনা?’ রহিম ভাবে।
পরক্ষণে সে বিস্মিত হয় এই দেখে যে কারোর এক কানে লম্বা দোল, তার মধ্যে তারা মেয়েদের মেকআপও করে টিকটক ভিডিও করছে! তারা এখন মহা ব্যস্ত। রহিমুদ্দিকে দেখার টাইম নাই। অঢেল টাকা তাদের। রহিমুদ্দি বিস্মিত মনে নিজেকেই জিজ্ঞেস করে, ‘এটা কি আমার গ্রাম? আমার সূবর্ণপুর?’
দলের মধ্য থেকে তাচ্ছিল্যের স্বরে কেউ বলে, ‘আরে! লহিম বাই যে! কবে আইছেন? ভালা আছেননি? গার্মেন্স কি বন্ধ?’
‘তুমি রবিন না? রাসেলের ভাই! উত্তর পাড়ার সেমেদ জ্যাডার পোলা?’
‘হ।’
‘তয়, তোমরা এহানে কী করো? তোমাদের এরূপ সাজগোজ কেন?’
রহিমের প্রশ্ন।
‘টিকটক করি ভাই, টিকটক করি! আমি এখন টিকটক রবিন! আর ও হইল ভাইরাল কাউসার। আমাদের লাখ লাখ ফলোয়ার! দোয়া কইরেন, ভাই!’
‘হ, দোয়া তো করি! কিন্তু তোমাদের লেখাপড়া?’
রহিমুদ্দির প্রশ্নে সমস্বরে হেসে ওঠে সবাই। তাচ্ছিল্যভরে উত্তর দেয় ভাইরাল কাউসার, আপনি না লেখাপড়া শিখছেন! কেলাস এইট পর্যন্ত! হুনছি কেলাসের ফার্ট বয়ও আছিলেন?
‘হ! আছিলাম! বাবায় মইরা যাওয়ায় আর পড়তে পারি নাই,‘ রহিমুদ্দির উত্তর।
রহিমের পা থেকে মাথা পর্যন্ত চেয়ে নেয় রবিন। টিপ্পনী কেটে বলে, ‘আফনে দেখি লেখাপড়া শিইকা, ঢাহায় থাইক্কা খেতই রইয়া গেছেন?’
রহিমুদ্দির চোখ ছলছল হলো। রবিন-কাউসারদের রংঢং আর তিরস্কার-অপমানে বিষিয়ে উঠল তার মন।
ধিক্কার দিল নিজেকে। বিড়বিড় করে বলে উঠল, ‘আমি তাইলে এই সমাজের অযোগ্য? অচল? আর এই অশিক্ষিত, নোংরা, অশ্লীল এই টিকটকাররা? তারা এখন সভ্যতার ধারক-বাহক?’
রহিমুদ্দির সারা গা থরথর, ক্রোধ ও অপমানে নীরব অশ্রুজল নেয়ে যায় কপোল! ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলল গ্রামের পেছনে দিকে, যেখানে নদীর শীর্ণ একটি ধারা মিশেছে এই গাঁয়ে। ‘কী হলো আমার সুন্দর সূবর্ণ গ্রামটির? গাঁয়ের ছেলেরা কত লেখাপড়া করত! ঢাকা থেকে কেউ এলে ছুটে যেত তার কাছে নতুন কিছু শেখার নেশায়! জানার আশায়! ঢাকার গল্প শুনে উজ্জীবিত হতো তারা! এরূপ ঈদের আগের দিনগুলোতে গ্রামখানি কত আনন্দমুখর থাকত! ঈদ আসছে! ঈদ আসছে! এপাড়া-ওপাড়া, বিবাহিত-অবিবাহিত কিংবা ইস্কুল্ল্যা-লাঙ্গইল্ল্যা কত দল-উপদলে খেলা হতো! ফুটবল, হাডুডু, ক্রিকেট; কত কী! রাতে যাত্রা কিংবা গানের আসর বসত! ভরপুর বর্ষায় নৌকাবাইচ, কত কী! দল বেঁধে চাঁদা ওঠাত ছেলেরা! অথচ আজ সব ছেলে টিকটকার? তরুণসমাজের এত অধঃপতন? দেশকে, দেশের হাজার বছরের সংস্কৃতিকে কোথায় নিয়ে যাবে তারা?’ রহিম ভাবে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রহিমুদ্দি বিড়বিড় করে, ‘হায় রে আধুনিকতা! হায় রে স্মার্টফোন, হায় রে ইন্টারনেট ‘
সূর্য ডুবতে ইশারা দিচ্ছে পশ্চিমের রক্তিম আভা। ইফতারের ওয়াক্তও রহিমকে বাড়ি টানতে পারছে না। তবু মায়ের সাথে ইফতার করতে হবে। কিন্তু পথ এগোয় না! পথে যেতে যেতে সেই একই ভাবনা তার, ‘আমি কি তবে কলুর বলদ? সেলাই মেশিনে সারা দিন মগ্ন থেকে কার সঞ্চয় করি? আমাদের চোখে কি ঠুলি পরানো? কিছুই দেখি না, জানি না দেশ, সভ্যতা, সংস্কৃতি কোন দিকে ধাবিত! কেবলই মালিকের উন্নয়নকাজ করি বলদের মতো! কই, আমাদের উন্নয়ন কই? কেবল শিল্পপতি, মালিক, উন্নয়নপতি, কোটিপতি হচ্ছে। আর আমরা? সারা জীবন কি এভাবে ঠকে যাব ‘
রহিমুদ্দি হাজারও প্রশ্ন। কে উত্তর দেবে?