জাকারিয়া সোহান
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ মার্চ ২০২৫
বাংলাদেশিদের প্রেম ফুটবলের সঙ্গে, কিন্তু বিয়ে হয়েছে ক্রিকেটের সঙ্গে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে খুবই প্রচলিত একটা কথা। সময়ের সঙ্গে ফুটবলের জনপ্রিয়তা যত কমেছে, ঠিক ততই বেড়েছে ক্রিকেটের। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট। স্পনসর, মিডিয়া ফোকাস, তারকাখ্যাতি—সবকিছুই ক্রিকেটকে ঘিরে।
তবে ফুটবলটা ছিল ভক্তদের হৃদয়ে। তাই তো রাত জেগে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের খেলা দেখে দেশের তরুণ প্রজন্ম! ঠিক তেমনি এক রাতে খেলা দেখতে বসেছিলেন অনেকে। সময়টা ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস। লিগ কাপে লিভারপুলের বিপক্ষে মাঠে নেমেছে লেস্টার সিটি। হঠাৎ লেস্টারের হয়ে বদলি নামলেন একজন। নাম হামজা চৌধুরী। এতেই নড়েচড়ে বসে এ দেশের রাতজাগা ফুটবলপ্রেমী।
চৌধুরী নামেই পাওয়া যায় বাঙালির গন্ধ। সেই বাঙালি কি পশ্চিমবঙ্গের, নাকি বাংলাদেশের, তা নিয়ে জাগে প্রশ্ন। অবশেষে ঠিকই জানা যায়, এই হামজার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। পুরো নাম হামজা দেওয়ান চৌধুরী। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যের লেস্টারশায়ারে জন্ম। তার মা বাংলাদেশি, জন্মদাতা বাবা গ্রেনাডিয়ান হলেও বেড়ে উঠেছেন সৎবাবা মোরশেদ দেওয়ান চৌধুরীর ঘরে। বাংলাদেশে তাদের বাড়ি হবিগঞ্জের বাহুবলে।
এর পর থেকেই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা স্বপ্ন দেখেন লাল-সবুজ জার্সিতে খেলবেন হামজা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও (বাফুফে) বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠে হামজার ব্যাপারে। পরিবারের চাওয়া ও বাফুফের উদ্যোগ মিলিয়ে হামজা বাংলাদেশের হয়ে খেলার প্রক্রিয়া শুরু করেন। কাজী সালাহউদ্দিন সভাপতি থাকতেই বাফুফের দিক থেকে হামজা ও তার পরিবারের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়।
হামজার লাল-সবুজের জার্সিতে খেলার পথ খুলতে কিছু শর্ত পূরণ হওয়ার দরকার ছিল। প্রধানত, অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নেওয়া, দ্বিতীয়ত মা-বাবার যেকোনো একজনের বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী হওয়া। এ ছাড়া ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) ছাড়পত্রসহ আরও কিছু বিষয় ছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের পাসপোর্ট হাতে পান হামজা। পরের মাসেই এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে বাংলাদেশের হয়ে খেলার অনাপত্তিপত্র দেয় এফএ। সেই অনাপত্তিপত্রসহ প্রাসঙ্গিক নথি ফিফার কাছ থেকে পাঠিয়ে দেয় বাফুফে।
১৯ ডিসেম্বর বাফুফে জানায়, হামজাকে বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধিত্ব করার অনুমতি দিয়েছে ফিফার প্লেয়ার স্ট্যাটাস কমিটি। একই দিন এক ভিডিও বার্তায় হামজা বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের হয়ে খেলতে যাচ্ছি। আশা করি দ্রুতই দেখা হবে।’
হামজার এই এক ঘোষণাতেই যেন দেশের ফুটবলের মরা নদীতে জোয়ার আসে। ভারতের এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ দলে ডাক পান হামজা। এর পরই আমূল পরিবর্তন আসতে থাকে দেশের ফুটবলে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো স্পনসরই ছিল না জাতীয় দলের জার্সিতে। সেখানে ঝটপট জার্সি স্পনসর পেয়ে যায় বাফুফে। এ ছাড়া পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসে ইউসিবি ব্যাংক।
এক হামজা যোগ দেওয়ায় যেমন উৎসবের আমেজ লাগে বাংলাদেশে, তেমনি চিন্তার ভাঁজ পড়ে ভারত শিবিরে। আর তাই বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচকে সামনে রেখে অবসর ভেঙে সুনীল ছেত্রিকে দলে ফেরায় ভারতের কোচ মানোলো মার্কেজ।
অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৭ মার্চ দেশে পা রাখেন হামজা। এতেই সিলেটে হামজাকে বরণ করে নিতে ভিড় জমান গণমাধ্যমকর্মী থেকে সাধারণ ফুটবল সমর্থকেরা। রাজকীয়ভাবে বরণ করা হয় এই ফুটবলারকে। এর আগে এমন কোনো বাংলাদেশি ফুটবলারকে এমন সাদরে বরণ করা হয়নি।
১৯ মার্চ বাংলাদেশ দলের ক্যাম্পে যোগ দেন হামজা। সেদিনই সংবাদ সম্মেলনে আসেন তিনি। হামজার সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে গণমাধ্যমের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ফুটবলের সংবাদ সংগ্রহ করতে সাধারণত এত গণমাধ্যমের উপস্থিতি দেখা যায় না। সেদিনই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ দলের সঙ্গে অনুশীলনে যোগ দেন হামজা।
শুধু হামজার অনুশীলন দেখতে বসুন্ধরার কিংস অ্যারেনায় হাজির হন দর্শক। সেখানে আগে ম্যাচের দিনেই দর্শক পাওয়া যেত না, সেখানে এক হামজার কারণে অনুশীলন দেখতে হাজির হন ভক্তরা। হামজা মাঠে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সমর্থকেরা উল্লাসধ্বনি দেয়। হামজা বল পেলেই চিৎকার দেয় সবাই। হামজা বল শট করলেই হাততালিতে ফেটে পড়ে সবাই।
এরপর ম্যাচ খেলতে ভারতের শিলংয়ে যায় বাংলাদেশ দল। ২৫ মার্চ ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে লাল-সবুজ জার্সিতে অভিষেক হয় হামজার। এ ম্যাচে নিজেকে উজাড় করে দেন এই মিডফিল্ডার। বাংলাদেশের ডিফেন্সে আস্থা হয়ে ওঠেন তিনি। অবসর ভেঙে ফেরা সুনীলকে রীতিমতো নিজের পকেটে রেখে দেন হামজা। স্ট্রাইকারদের গোল মিসের মহড়ায় ড্র করে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।
এক হামজা হয়তো দেশের ফুটবলের আমূল পরিবর্তন করতে পারবেন না। তবে তার উপস্থিতি এ দেশের ফুটবলে নতুন আশার সৃষ্টি করে। মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সমর্থকদের আবারও আগ্রাহী করে তোলে। এ দেশের তরুণ প্রজন্মদের চাওয়া, হামজাদের হাত ধরেই এগিয়ে যাক দেশের ফুটবল। সেই চাওয়া হামজা কতটা পূরণ করতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে।