জি এম কিবরিয়া
প্রকাশ: 11শে বৈশাখ ১৪৩২ | ২৪ই এপ্রিল ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
অবাধ তথ্য প্রবাহের স্রোতে আমরা যেন আজ ভাসমান শেওলা। যার কোন স্থীতি নেই, রীতি নেই, নীতি নেই। যেন এক নেই রাজ্যের বাসিন্দা। নেই, তাই পাওয়ার জন্য এত ব্যাকুলতা, এত অস্থিরতা। আর অস্থিরতা কেড়ে নিচ্ছে আমাদের মনের সকল সুখ, প্রশান্তি ও ভাবাবেগ। অর্থাৎ AI এর এই যুগে জ্ঞান সাগরে ভেসে ভেসে জ্ঞানের দেখা না পাওয়া এক কাঙ্গাল আমরা।
‘ফকির লালন মরলো জল পিপাসায়রে, কাছে থাকতে নদী মেঘনা’ চরণটি অতি পরিচিত। তবে লালন ফকির বেঁচে থাকলে আজকের এই তথ্য প্রবাহের যুগে তিনি দ্বিতীয় চরণে হয়তো গাইতেন, ‘কাছে থাকতে আমার বদনা (পানির পাত্র)’।
জ্ঞানার্জন আজ এত সহজ, এত অবাধ তবুও কেন জ্ঞান আজ এত অধরা? এটাই রহস্য! প্রাথমিক বিশ্লেষণে অধিক, অবাধ ও অপ্রয়োজনীয় তথ্যকে আমরা দায়ী করতে পারি। এই মাত্রাতিরিক্ত ও সহজলভ্য তথ্য আমাদের মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। যেমন: সারা রাত প্রচুর মাছ ধরে, তলা বিহীন ঝুড়িতে রাখলে যা হয়, আমাদের অবস্থাও তাই হয়েছে। আমরা যেন আজ পথের মাঝে পথ, আর জ্ঞান সাগরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি।
প্রখ্যাত আমেরিকান কবি টি এস এলিয়ট (Thomas Stearns Eliot) ১৯৩৪ সালে আজকের এই তথ্য প্রবাহ ও প্রজন্মের অস্থিরতাকে উপলব্ধি করেই যেন তাঁর বিখ্যাত গীতিনাট্য কবিতা “দ্য রক” (The Rock) লিখেছিলেন। উক্ত গীতিনাট্যের বিখ্যাত তিনটি চরণ হলো:
“Where is the Life we have lost in living?
Where is the wisdom we have lost in knowledge?
Where is the knowledge we have lost in information?”
বাংলায় এর ভাবানুবাদ অনেকটা এরকম:
কোথায় সেই জীবন যা আমরা জীবনধারণে হারিয়েছি?
কোথায় সেই প্রজ্ঞা যা আমরা জ্ঞানে হারিয়েছি?
কোথায় সেই জ্ঞান যা আমরা তথ্যে হারিয়েছি?
এই কবিতাংশটি যেন বর্তমান সমাজের একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। কবি এলিয়ট এখানে জ্ঞান, তথ্য এবং জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যেকার সম্পর্ক এবং ক্রমশঃ তথ্য ও জ্ঞানের আধিক্যের কারণে কিভাবে আমাদের জীবনের গভীরতা ও প্রজ্ঞা হারিয়ে যাচ্ছে, সেই বেদনার কথা তুলে ধরেছেন কবিতায়।
জ্ঞানের বিশ্লেষণ তথা জ্ঞান সম্পর্কিত মডেল নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের মতে, বিখ্যাত DIKW মডেল (Data>Information>Knowledge>Wisdom) নাকি কবি টিএস এলিয়টের উক্ত কোরাসেস থেকে উদ্ভূত বা আবিষ্কৃত হয়েছে।
এই মডেলটি জ্ঞানের কোন স্তরে কিভাবে কাজ করে, তা বিশ্লেষণ করা নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। তবে উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, অবাধ ও সহজ তথ্য প্রবাহ তথা জ্ঞানার্জনের অতি সহজ মাধ্যম থাকা সত্ত্বেও কেন আমারা প্রকৃত জ্ঞানার্জন করতে পারছি না, প্রজ্ঞাবান হতে পারছি না, তা অন্তর দিয়ে অনুধাবন করাও অতীব জরুরি।
একজন খনির মজুর যেমন পাথরের বোঝা বয়ে দৈনিক হাজিরা গুণে পাঁচশো টাকা। তার জীবনমানের তেমন উন্নতি নেই। যদি সে জানতো, কত মূল্যবান হিরা-চুন্নি, পাথর বহন করেছে জীবনভর, টনে-টনে এবং বিনিময়ে মিলেছিল কেবল পাঁচশো টাকা, তবে কি না আফসোস হতো তার! আফসোসে প্রাণবায়ু বেড়িয়ে যেত কি না? যেতো। তেমনি, এই তথ্য প্রবাহের যুগে, জ্ঞান আহরণের এত সুযোগ থাকা স্বত্তেও, আমরা যথেষ্ট জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে প্রজ্ঞাবান তথা মানুষ হতে না পারায় আমাদের প্রাণবায়ু কি বেড়িয়ে যেতে চাচ্ছে? উত্তর: না। অজ্ঞ থাকার যন্ত্রণা কিংবা প্রজ্ঞাবান না হওয়ার আত্মগ্লাণী কি আমাদের সমাজে দেখা যায়? এখানেও উত্তর: না।
কেন? ব্যক্তির অনুভূতি এখানে এখনও জাগ্রত হয়নি। দায় কার? অবশ্যই ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রকে এই দায় নিতে হবে। আর এজন্যই ব্যক্তি, সমাজ কিংবা আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে এত বিশৃঙ্খলা, এত দুঃখ, এত যাতনা! এ সমাজে মানুষ মুলত: গরিব, ধনের জন্য নয়, জ্ঞানের জন্য! যতদিন এই সত্যটুকু উপলব্ধিতে না আসবে, ততদিনই আপনি গরিব থাকবেন।
জ্ঞানার্জনের বিষয়ে ইসলামের অন্যতম ইমাম, ইমাম ইবনে রজব আল-হাম্বলী প্রায় ১২০০ বছর পূর্বে জ্ঞানের স্তর বিন্যাস ও মানুষের আচরণগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে, একটি চমৎকার দর্শন উপস্থাপন করে গেছেন, যা আজও সমানতালে সমাদৃত। ইমাম হাম্বলীর মতে, জ্ঞানের তিনটি স্তর রয়েছে:
১। প্রথম স্তর: প্রথম স্তরে যখন কেউ প্রবেশ করবে, সে অহংকারী হয়ে উঠবে, যেন সে জগতের সব কিছুই জেনে ফেলেছে, এমন ভাব দেখাবে। আজ সবজান্তা সমশেরে দেশ ভরে গেছে।
২। দ্বিতীয় স্তর: যখন দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করবে, তখন তিনি বিনয়ী হবেন। জ্ঞানের ক্ষুধা বা আকাঙ্ক্ষা তীব্র থেকে তীব্রতর হবে এবং জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ব্যাকুল থাকবেন।
৩। তৃতীয় স্তর: আর যখন তিনি তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করবেন, তখন নিজের অজ্ঞতাকে উপলদ্ধি করতে পারবেন। তিনি তখন আফসোস করতে থাকবেন যে, “ব্রহ্ম্যান্ডের বিপুল জ্ঞান ভান্ডারে কতইনা কাঙ্গাল আমি!” এই তৃতীয় স্তরেই মানুষ প্রজ্ঞাবান হয়ে উঠে।
বর্তমান তথ্য ও জ্ঞানের ছড়াছড়িতেও যদি আপনি ‘জ্ঞান’ অর্জন তথা ‘প্রজ্ঞাবান হওয়ার পদ্ধতি যদি আপনার জানা না থাকে, তবে কি জীবন অর্থহীন মাখাল ফলে পরিণত হবে না?
এই প্রজ্ঞার (Wisdom) পথনির্দেশণা পেতে আপনার DIKW Model বা পিরামিড (Data>Information>Knowledge>Wisdom) সম্পর্কেও ধারণা থাকা জরুরি। নিন্মে অতি সংক্ষেপে DIKW পিরামিড নিয়ে আলোচনা করা হলো:
১. ডাটা (Data): পিরামিডের প্রথম স্তরে আছে ডাটা। এটি বর্তমানের অবাধ তথ্য প্রবাহ, যা কাঁচা (Raw), অপ্রক্রিয়াজাত, পরিসংখ্যান আকারে বা প্রতীকরূপে বা কোন অর্থ ছাড়াই আমাদের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই ডাটার মোহে আচ্ছন্ন হচ্ছি প্রতিরত। ইস! কত লাইক!! কত ফলোয়ার!! আমি তো ভাইরাল!! এহেন মোহ আমাদেরকে মুহুর্তে হিরো কিংবা জিরো করে সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। মূলতঃ এটি জ্ঞানের অতি প্রাথমিক স্তর, যেখানে মানুষ অহংকারী, অস্থির বা আত্ম প্রচারে মগ্ন থাকেন।
২. তথ্য (Information): পিরামিডের দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে তথ্য। যখন ডাটা (Data) কে সংগঠিত করে কোন কাঠামো বা রূপ বা ফরমেট বা প্রেক্ষাপট দেয়া হয় এবং তা অর্থপূর্ণ ও কার্যকর করতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সংশ্লেষ ঘটানো হয়, তখন তা তথ্যে (Information) পরিণত হয়। এই স্তরটিও জ্ঞানের প্রথম স্তর, যেখানে মানুষ নিজেকে অধিক জান্তা পন্ডিত মনে করে এবং অহংকারী হয়ে উঠে।
৩. জ্ঞান (Knowledge): পিরামিডের তৃতীয় স্তরে রয়েছে জ্ঞান। এই স্তরে তথ্য (Information) ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে প্রচলিত নিয়ম, কানুন, আদব ও অভিজ্ঞতার সংশ্লেষ ঘটিয়ে তা বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়। এই প্রকৃয়াই হলো জ্ঞানার্জন। ইমাম হাম্বলীর মতে, এটি হলো জ্ঞানের দ্বিতীয় স্তর। এই স্তরে মানুষ প্রবেশ করলে বিনয়ী হয়। জ্ঞান পিপাসায় ছটফট করে এবং জ্ঞানের সন্ধান করে।
৪. প্রজ্ঞা (Wisdom): এটি পিরামিডের সর্বোচ্চ ও শেষ স্তর, যেখানে একজন ব্যক্তি অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সংমিশ্রন ও প্রয়োগ ঘটিয়ে তাঁর সুবিবেচনা, অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতার সাথে তা সমন্বয় করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এখানেই নীতিও মূল্যবোধের জন্ম হয়। এই স্তরেই মানুষের অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়। ইমাম হাম্বলীর মতে, এটি জ্ঞানের তৃতীয় স্তর। এই স্তরে প্রবেশ করলে মানুষ নিজের অজ্ঞতার পরিচয় পায়। ব্রহ্ম্যান্ডের বিপুল ও অব্যক্ত বিশাল জ্ঞানরাশি সম্পর্কে তাঁর ধারণা জন্মে। এই বিশাল জ্ঞানরাশির তুলনায় তিনি যে কত অজ্ঞ, তা অনুধাবন করতে পারেন এবং অন্তরে প্রলাপ করতে শুরু করবেন যে, “হায় হায় আমি কি অজ্ঞ! জীবনের এতগুলো বছরে কি করলাম? আমিতো কিছুই জানি না!” এই স্তরেই একজন প্রজ্ঞাবান মহামানবে পরিণত হয়ে থাকেন।
আমাদের পৃথিবীকে যুদ্ধ-বিগ্রহ, কলহ-দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধা-কান্না মুক্ত করে একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী উপহার এবং এখানে স্বর্গের সুবাতাস বয়ে দিতে প্রয়োজন জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। অবাধ তথ্য প্রবাহ, তথা চ্যাট জিপিটি, গুগল প্রফেসর, ইউটিউব, ফেসবুক বা অসংখ্য ই-বুক, গবেষণা ও ইউটিউব বক্তব্য আজ সহজে ও প্রায় বিনামূল্যে গ্রামে বসেই পাওয়া যাচ্ছে। তবুও যদি আমরা প্রজ্ঞাবান না হতে পারি তবে কি পরবর্তী প্রজন্ম ক্ষমা করবে?
যতই নির্মোহ ও নির্লিপ্ত থাকেন না কেন, সময় ও প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতেই হবে। মনে রাখতে হবে, মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে, আর মাকড়শা সংগ্রহ করে বিষ! আপনি এই সুযোগ কাজে লাগাবেন কি না, আপনার বিষয়। জ্ঞান সমুদ্র থেকে জ্ঞান নাকি আবর্জনা সংগ্রহ করবেন, তাও আপনার একান্ত বিবেচনা। তবে, এইটুকু বলতে পারি, প্রজ্ঞাবান না হলে আপনি আপনাকেই চিনতে পারবেন না, স্রষ্টা থাকবে অধরা।
লেখক: জি এম কিবরিয়া, ক্লিন এন্ড গ্রিন ফাউন্ডেশন ও গরিব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।