খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১০ মে ২০২৫
ডলারের তীব্র সংকট, ঋণের নামে ব্যাংক লুটপাট এবং অর্থ পাচারসহ দেশের নানামুখী সংকট মোকাবেলায় ক্ষমতা গ্রহণের ৩৯ দিনের মাথায় উন্নয়ন সহযোগীদের অতিরিক্ত ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দিতে অনুরোধ করেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড.ইউনূস। যা অন্তর্বর্তী সরকারের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা নিজেই জানান। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েও তিনি দেশ পুনর্গঠন ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে সহায়তা করতে দাতা সংস্থাগুলোকে অনুরোধ করেন। কিন্তু প্রায় আট মাস পেরিয়ে গেলেও সে আহ্বানে এখন পর্যন্ত সাড়া মেলেনি।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের নয় মাস (জুলাই-মার্চ) পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণ প্রতিশ্রুতি মিলেছে ৩০০ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের মতো, যা গত অর্থবছরের চেয়ে সাড়ে ৫৮ শতাংশ কম। অথচ আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) একই সময় প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল ৭২৪ কোটি ২১ লাখ ৭০ হাজার ডলারের।
দায়িত্ব নেয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধ ও আর্থিক খাত সংস্কারে দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বড় আকারে অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি মিলেছে। এছাড়া পাইপলাইনে থাকা বৈদেশিক সহায়তার বাইরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে আরো ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা চায় ড. ইউনূসের সরকার। এর মধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলার চাওয়া হয় আইএমএফের কাছে। আর এক বিলিয়ন করে ২ বিলিয়ন ডলার দিতে বিশ্বব্যাংক ও জাইকাকে অনুরোধ জানানো হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত সেপ্টেম্বরে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে যান। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গেলেও তিনি বেশ কয়েকজন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, বিভিন্ন সংস্থার প্রধান ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। নিউইয়র্কের এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি বাংলাদেশের নতুন যাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের অংশীদারত্বও চান। এরপর চীন, থাইল্যান্ড, কাতারসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশ সফর করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। সেই সঙ্গে দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরো নিবিড় করতে উদ্যোগ নেয়ার কথাও জানিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। যদিও এখন পর্যন্ত তার সুফল মেলেনি। উল্টো বৈদেশিক ঋণ প্রতিশ্রুতি প্রতিনিয়তই কমছে।
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাতা সংস্থাগুলো মূলত সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিবেচনায় বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ ও অনুদান হিসেবে অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের নয় মাস পেরিয়ে গেলেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ওই অর্থে আসেনি। সে কারণেই বৈদেশিক ঋণ প্রতিশ্রুতি কম। তবে অন্তর্বর্তী সরকার বৃহৎ দুই-একটি প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছে। তাতে বিনিয়োগ ও বৈদেশিক সহায়তাকারী দেশগুলো পরিকল্পিত বিনিয়োগের দিকে যেতে পারে।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি আসে মূলত দুইভাবে। প্রথমত, বাজেট সহায়তা এবং দ্বিতীয়ত, প্রকল্পের ঋণ সহায়তা হিসেবে। ঋণ সহায়তা পাওয়া যায় মূলত নতুন কোনো প্রকল্প নেয়া হলে। এ সরকার নতুন কোনো প্রকল্প নিচ্ছে না। যে কারণে বৈদেশিক ঋণ সহায়তা কম।’
সরকারের বাজেট সহায়তার অংশ হিসেবে নতুন ঋণ আসবে বলে মনে করেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আসন্ন বাজেটে উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ কোটি টাকার ওপরে বাজেট রাখা হতে পারে। সেখানে ৪৫ শতাংশ বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। এর বাইরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অর্থ ছাড় হলে সেখানে কিন্তু বৈদেশিক ঋণ সহায়তার বড় অংশ যুক্ত হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ইনস্টিটিউট অব ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘বিদেশী ঋণের বড় অংশই আসে বাজেট সহায়তায়। সরকারের রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় যে ঘাটতি থাকে সেটা পূরণ হয় মূলত বৈদেশিক ঋণ সহায়তা নিয়ে। বিগত কয়েক বছরে আমাদের দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও কর্মসংস্থান বড় আকারে কমে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে জনগণের সঞ্চয় করার প্রবণতা কমে গেছে। বৈদেশিক ঋণ সহায়তাকারী দেশগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে। স্থিতিশীলতা না আসা পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি বৃদ্ধির আশা করা ঠিক হবে না। দাতারা ছয় মাস বা এক বছরের জন্য অর্থায়ন করে না।’
সূত্র: বণিকবার্তা
খবরওয়ালা/এমএজেড