খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: শুক্রবার, ৪ জুলাই ২০২৫
৫ আগস্টের পর থেকে বেশ কিছু ‘মবের’ ঘটনায় নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এর সর্বশেষ সংযোজন পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জাহেদ মো. নাজমুন নূরের প্রত্যাহার।
প্রশ্ন উঠছে, একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির নেতাকর্মীরা মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন কি না। অনেকের অভিযোগ, দলটি ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি হাতিয়ার হিসেবে মব ব্যবহার করছে।
যদিও এ ধরনের ঘটনায় এনসিপির একাধিক নেতা মবকে ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দমন-পীড়নেরই বহিঃপ্রকাশ এটি। আবার কেউ কেউ বলছেন, গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের দাবি আদায়ের অধিকার এনসিপির আছে। তবে অনেক সময় অন্য রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডও এনসিপির সঙ্গে মিলিয়ে প্রচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মব ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সহজ। তাই অনেকে একে অন্যদের ওপর এনসিপির প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবে দেখছেন। তবে তারা এটিও বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের সঙ্গে যায় না এবং একে ‘অপরাজনীতি’ বলাই সঠিক।
গত মঙ্গলবার ছাত্রলীগের এক নেতাকে পুলিশে দেওয়া হলেও কোনো মামলা না থাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
এ নিয়ে পটিয়া থানায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল তার ফেসবুক পেজে লেখেন, ‘পটিয়া থানা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে!’
এ ঘটনার জেরে বুধবার সকালে ওসির অপসারণসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। ওই দিন মধ্যরাতে ওসি নাজমুন নূরকে প্রত্যাহার করা হয়।
এর আগে ২৯ মে রংপুরে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের বাড়িতে হামলার জন্য রংপুর জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও এনসিপির নেতাকর্মীদের দায়ী করা হয়। অভিযুক্তদের দাবি, সেদিন আগে তাদের ওপর হামলা হয়েছিল।
১৯ মে ঢাকার ধানমণ্ডিতে হাক্কানী পাবলিশার্সের প্রকাশক গোলাম মোস্তফার বাসার সামনে মব তৈরি করে স্লোগান দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন নেতা। পুলিশ জানায়, মামলা না থাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব নয়। এ নিয়ে বাগবিতণ্ডা হলে তিনজনকে আটক করা হয়। পরে মুচলেকা দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ। এ জন্য তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সঠিক কর্মসূচি ও নেতৃত্ব না থাকায় অনেককে নানা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। এটা আমাদেরও সীমাবদ্ধতা।’
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা নিজেদের দাবি নিজেদের নামেই প্রকাশ করি, অন্য কিছুর আড়ালে নয়। মবের সঙ্গে দলের মিল খুঁজে সব কিছুর দায় এনসিপির ওপর চাপানোর চেষ্টা চলছে। যৌক্তিক দাবি আমরা নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক উপায়ে আদায়ের চেষ্টা করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যখন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে কোনো ঘটনা ঘটে, তখন তাকে আর মব বলা চলে না। মবকে রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা দলের ধ্বংস ডেকে আনবে।’
এর আগে ২২ জুন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদার গলায় জুতার মালা পরিয়ে তাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীদের দায়ী করা হয়। দুই দিন পর খুলনায় সাবেক এক এসআইকে মারধর করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এরপর কেএমপি সদর দপ্তর ঘেরাও করে কেএমপি কমিশনারের অপসারণ দাবি করা হয়।
এনসিপি নিয়ে একই সুরে কথা বলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘যারা ১৫ বছর ধরে নিপীড়িত হয়েছেন, তারা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা সবাই আইনের শাসন চাই। অথচ নিজেরাই আইন হাতে নিচ্ছি। রাজনীতি না থাকলে এসব অপরাজনীতি চলে। এরশাদের আমলে আ স ম রবের শার্ট ছিঁড়ে ফেলা, এক-এগারোর সময়ে মাহবুবকে হেনস্তা—এগুলোও একই ধারা।’
তার মতে, ‘মবকে দলীয়ভাবে ব্যবহার করা দলের বিকাশের বদলে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে। যা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত।’
সূত্র: বিবিসি
খবরওয়ালা/এমইউ