এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: বুধবার, ২৭ আগস্ট ২০২৫
একদিন হঠাৎ কলকাতা পুলিশ নজরুলের বাড়িতে তল্লাশি চালায়। উদ্দেশ্য— কোনো নিষিদ্ধ বই পাওয়া যায় কি না। সেই সময় বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, প্রলয়শিখা প্রভৃতি গ্রন্থ ইতিমধ্যেই বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পুলিশ কিছু খুঁজে পেল না।
নজরুল কোনো বাধা দিলেন না, ঘরের জিনিসপত্র লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে—তবুও যেন তাতে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই।
কিন্তু পুলিশ যখন ঘরের এক কোণে রাখা বাক্সটির দিকে এগোল, তখনই কবি যেন অন্য মানুষ হয়ে উঠলেন। পাগলের মতো ছুটে গিয়ে অনুরোধ করলে
“আর যাই করুন, এই বাক্সে হাত দেবেন না।”
কৌতূহলী পুলিশ বাক্স খুলল। ভিতরে সুন্দরভাবে সাজানো ছিল এক শিশুর জামাকাপড়, ছোট ছোট খেলনা।
ওগুলোই ছিল নজরুলের অকালপ্রয়াত পুত্র অরিন্দম বুলবুলের স্মৃতি।
লজ্জায় মাথা নোয়ালেন পুলিশ কর্মকর্তা। দেখলেন, দ্রোহের কবির চোখে জল টলমল করছে।
বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী রূপে পরিচিত হলেও নজরুলের অন্তরে ছিল সন্তানপ্রেমের অফুরন্ত কোমলতা। এ প্রসঙ্গ অনেকবার উঠে এসেছে তাঁর ছেলে কাজী সব্যসাচীর (ডাকনাম সানি) স্মৃতিচারণায়।
সব্যসাচী বলেছিলেন—’এমন উদার হৃদয়বান বাবা ক’জন পেয়েছেন জানি না। আমরা দুই ভাই সত্যিই ভাগ্যবান ছিলাম।
নজরুলের চার সন্তানের মধ্যে প্রথম ছেলে কৃষ্ণ মুহম্মদ অল্প বয়সেই মারা যান। দ্বিতীয় ছেলে অরিন্দম বুলবুল মাত্র চার বছর বয়সে বসন্তরোগে চলে যায়। এই মৃত্যুশোক কবিকে ভেতরে ভেতরে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল।
সান-ইয়াৎ সেনের নাম অনুসারে তিনি বড় ছেলে সব্যসাচীর নাম রাখেন সানি, আর লেনিনের নাম অনুসরণে অনিরুদ্ধকে ডাকতেন নিনি।
বাবার মায়া, বাবার ছড়া
সন্তানদের নিয়ে তিনি লিখতেন মজার ছড়া— “তোমার সানি যুদ্ধে যাবে/ মুখটি করে চাঁদ পানা/ কোল-ন্যাওটা তোমার নিনি/ বোমার ভয়ে আধখানা।’
‘সানি নিনি দুই ভাই/ ব্যাঙ মারে ঠুইঠাই।” বাড়ির বাইরে গেলে ছেলেদের জন্য নিয়মিত চিঠি লিখতেন তিনি। প্রতিটি চিঠির শেষে থাকত— ’আমার চুমু নিও। ইতি বাবা।’
স্বপ্নের বাড়ি
অসুস্থ হওয়ার আগেই কবি কলকাতার বাগুইআটিতে একটি বাড়ি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। জমির বায়নাও দিয়েছিলেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে তিনি সেখানে যেতেন পরিকল্পনা করতে।
তিনি বলতেন— ‘বাড়িটা হবে বাংলো প্যাটার্নের। সামনে একটা পুকুর থাকবে, সেখানে মাছ ছাড়া হবে। দক্ষিণ দিকে থাকবে আমার আর নিনির ঘর। তবে নিনি যেন পুকুরের কাছে না যায়—সে বড় শান্ত, সাঁতার জানে না।”
কিন্তু হঠাৎ একদিন জমি দেখতে গিয়ে পাশ দিয়ে ময়লার গাড়ি যাওয়ায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান। দুর্গন্ধে নাক চেপে ধরে ছেলেদের নাকে সুগন্ধি ঘষে দিয়ে বলেছিলেন— ‘না, এখানে বাড়ি হবে না। এই দুর্গন্ধে লেখালেখা হবে না, ছেলেরা অসুস্থ হয়ে পড়বে।’
অতঃপর আর বাড়ি করা হয়নি।
সন্তানস্নেহে উদার, শাসনে কঠোর
সন্তানদের নিয়ে নাটক-সিনেমা দেখতে যেতেন নজরুল, ফুটবল খেলাও মিস করতেন না। কিন্তু সন্তান হারিয়ে ফেলার ভয়ে সবসময় সজাগ থাকতেন। একবার মোহামেডান স্পোর্টিং বনাম কেওসিবি খেলা দেখতে গিয়ে মাঠে হঠাৎ ছেলেদের খুঁজে না পেয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন—
“সানি কোথায়, নিনি কোথায়?” মাঠসুদ্ধ দর্শক তাকিয়ে রইল। শেষে দুই ছেলেকে খুঁজে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন কবি।
তবে শাসনের ব্যাপারেও ছিলেন কড়া। একবার সানি-নিনি মিলে সোফায় আগুন ধরিয়ে দিলে নজরুলের চোখের কঠোর দৃষ্টি দেখে দুজনেরই হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছিল।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের উনপঞ্চাশতম বর্ষে আমরা স্মরণ করি—
বিদ্রোহের মধ্যেও তিনি ছিলেন এক গভীর সন্তানবৎসল পিতা। তাঁর জীবনের এই অজানা কাহিনি আমাদের সামনে ভিন্ন আলোয় তুলে ধরে নজরুলকে— একইসাথে দ্রোহের প্রতীক, আবার কোমল হৃদয়ের ভালোবাসার কবি।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক
খবরওয়ালা/এমএজেড