খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে রাজবাড়ীর সমির মণ্ডল ও গোপালগঞ্জের জয়ন্তী বিশ্বাস বিয়ে করেছিলেন। দীর্ঘ নয় বছর পর তাদের ঘর আলোকিত করে আসে কন্যা প্রতিভা মণ্ডল। বহু প্রতীক্ষার পর জন্ম নেওয়া মেয়েকে ঘিরে ছিল অসীম স্বপ্ন। এরই মাঝে জন্ম নেয় আরও এক কন্যা সন্তান। সমির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। রাজধানীর মিরপুর টোলারবাগ স্টাফ কোয়ার্টারে তিন বছরের প্রতিভা ও ছয় মাস বয়সী জানভিকে নিয়ে ছোট্ট সংসার ছিল তাদের। তবে ডেঙ্গু সেই সাজানো সংসার ভেঙে দিয়েছে।
সমির জানান, প্রথমে জয়ন্তীর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। কয়েকদিন পর আক্রান্ত হয় মেয়ে প্রতিভাও। শুরুতে বাসায় চিকিৎসা নিলেও অবস্থা খারাপ হলে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। কিন্তু শেষমেশ বাঁচানো যায়নি। গত ২১ সেপ্টেম্বর ভোরে মৃত্যুবরণ করেন জয়ন্তী বিশ্বাস। এর একদিন পর মেয়ে প্রতিভাও প্রাণ হারায়। মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে সংসারটি।
আবেগঘন কণ্ঠে সমির বলেন, ‘২০১৩ সালে জয়ন্তীকে ভালোবেসে পারিবারিকভাবে বিয়ে করি। নয় বছর ধরে কোনো সন্তান হয়নি। বহু চিকিৎসার পর ২০২২ সালের ১১ জুন প্রতিভার জন্ম হয়। স্ত্রীর স্বপ্ন ছিল প্রতিভাকে ডাক্তার বানাবে। সব শেষ হয়ে গেল। আমার ছোট মেয়ের বয়স এখন মাত্র ছয় মাস, সে-ও মা-হারা হলো। আমি কীভাবে এগোবো?’
তিনি যোগ করেন, ‘২১ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় চিকিৎসকরা জয়ন্তীকে মৃত ঘোষণা করেন। সেদিনই তার লাশ রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বাঘুটিয়া গ্রামে নিয়ে গিয়ে সমাধি দিই। রাতেই ঢাকায় ফিরে আসি প্রতিভার কাছে। পরদিন রাত ৯টায় ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেও মারা যায়। ২৩ সেপ্টেম্বর সকালেই তাকে মায়ের পাশেই সমাহিত করি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জয়ন্তী ও প্রতিভার মতো ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৮ জন। যদিও শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় কারও মৃত্যু হয়নি। এ সময়ে ২১৯ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে এ মৌসুমে ডেঙ্গুতে ভর্তি হয়েছেন মোট ৪৪ হাজার ৬৯২ জন। তাদের মধ্যে ৪২ হাজার ৪৭৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, মৃত্যুর প্রধান কারণ শক সিন্ড্রোম। মোট মৃত্যুর ৫৬ শতাংশ এ কারণে হয়েছে। এছাড়া মৃতদের ৪০ শতাংশ ভুগছিলেন জটিল রোগে। মৃতদের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১৯ জন এবং শূন্য থেকে ১০ বছর বয়সী ১৬ জন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর জানান, জুলাই থেকে ডেঙ্গু বাড়তে থাকে, সেপ্টেম্বরে সর্বাধিক প্রকোপ দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুতে নতুন কোনো চিকিৎসা নেই। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শনাক্তকরণ কিট, ওষুধ ও স্যালাইনের কোনো সংকট নেই।’
তিনি আরও জানান, প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসা টিম গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে দেশে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় এবং মারা যান ৫৭৫ জন। এর আগের বছর ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০৫ জন মারা যান এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন।
খবরওয়ালা/টিএসএন