খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের নাগরিক ভিটো বলি বোঙ্গেঙ্গে গত তিন বছর ধরে বগুড়ায় বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় এক পক্ষী ব্যবসায়ী তার ভ্রমণ দলিলপত্র ও অন্যান্য নথি কেড়ে নিয়েছেন। তার কাছ থেকে কমপক্ষে সাত হাজার আমেরিকান ডলার আত্মসাৎ করা হয়েছে। বগুড়া সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি।
ভিটো সম্প্রতি নিজের একটি ভিডিও ধারণ করে পরিচিতদের কাছে প্রেরণ করেন। ওই ভিডিওতে তিনি বলেন, “আমাকে আটকে রাখা হয়েছে। আমি দেশে ফিরে যেতে চাই। আমার স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে যেতে চাই।” এই ভিডিওর সূত্র ধরেই তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারে সমকাল।
গতকাল সোমবার মহাস্থানগড়ের গোকুল মেধের পেছনে উত্তরপাড়ায় গিয়ে একটি ত্রিতল ভবন দেখা যায়। বাড়িটির চারপাশে ঝাউগাছের ঝোপ। ভবনের নিচতলায় বসবাস করেন আখতারুজ্জামানের পুত্র পক্ষী ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান পলাশ। উপরের তলায় তিনি জাল টাঙিয়ে পাখি পালন করেন। সংবাদকর্মী পরিচয় জানার পরই পলাশ ও তার পরিবারের সদস্যরা গা ঢাকা দেন। নিচতলার একটি অন্ধকার কক্ষে ভিটোর দেখা মেলে। তিনি অভিযোগ করেন, “পলাশ আমাকে জোর করে ধরে রেখেছে।”
ভিটো জানান, তিনি পাখির ব্যবসা করতেন। তার আদি নিবাস কঙ্গোর এভিগামার কিউ/ইলোসুড কালামু কিনসাশা গ্রামে। পিতার নাম বোঙ্গে জেনই এবং মাতার নাম গাবি বোয়েকা। তিনি বৈধ পন্থায় বিভিন্ন রাষ্ট্রে পাখি রপ্তানি করতেন। এই সূত্রেই পলাশের সঙ্গে তার অনলাইনে পরিচিতি ঘটে। পলাশ তাকে অনেক উচ্চ মূল্যে পাখি কেনার প্রস্তাব দেন এবং বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানান। এর ফলস্বরূপ, ২০২২ সালের ১ নভেম্বর এক মাস মেয়াদের পর্যটন ভিসায় তিনি বাংলাদেশে আগমন করেন।
ইমিগ্রেশন সূত্র অনুযায়ী, তার পাসপোর্টের নম্বর হলো ওপি-১১৩৪৪৩২। বিমানবন্দরে নেমে ভিটো সোনালী ব্যাংক থেকে ৫০ ডলারের বিনিময়ে ৫০ হাজার ৭৫ টাকা গ্রহণ করেন। এরপর বাইরে অপেক্ষারত পলাশের সাথে তিনি বগুড়ায় তার বাড়িতে আসেন। এক মাস পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই ভিটো স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলে পলাশ তার পাসপোর্টসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেন।
ভিটো আরও জানান, গত ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি গোপনে পলাশের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন। অন্য এক পক্ষী ব্যবসায়ী সোহেল রানাকে সঙ্গে নিয়ে বগুড়া সদর থানায় হাজির হন। সেখানে তিনি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসিরের সঙ্গে তার কথোপকথন হয়। ওসি উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদী হাসানকে অভিযোগটি তদন্ত করার নির্দেশ দেন। কিন্তু ১২ দিন অতিক্রান্ত হলেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো বাদীর অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তা অভিযুক্তদের সঙ্গে আঁতাত করে তদন্ত প্রক্রিয়া থামিয়ে দিয়েছেন।
ভিটো জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে তার স্ত্রী গ্লোরিয়া এনটাঙ্গা মুটোম্বো কঙ্গোতে তাদের বাড়ি বিক্রি করে পলাশের কাছে অর্থ পাঠাতে থাকেন। এই সব অর্থ গ্রহণের পরও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। কয়েক ধাপে অনলাইন ব্যাংকিং লেনদেনের মাধ্যমে ডলার গ্রহণ করেছেন পলাশ। বর্তমানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ঘুমের জন্য তাকে প্রতিদিন ওষুধ সেবন করতে হয়। দেশে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় তিনি পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে পলাশ ও তার স্ত্রী রোকসানার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। বাড়িতে তার বোন পলি বেগম জানান, পলাশ বাড়িতে থাকেন না এবং তিনি কোথায় থাকেন তা তারা জানেন না। স্থানীয় পক্ষী ব্যবসায়ী সোহেল রানা বলেন, পলাশ আমার কাছ থেকেও প্রায় ১২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে প্রতারণা করেছে।
তদন্তকারী এসআই মেহেদি হাসান বলেন, “আসামিকে গ্রেপ্তার করার উদ্দেশ্যে আমরা রওনা হয়েছিলাম। মাঝপথে গিয়ে শুনতে পেলাম, বিষয়টি আপস-মীমাংসা করা হচ্ছে। এই কারণে আমি আর অগ্রসর হইনি। বাদীপক্ষও আমাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি। এই কারণে আমরা এখনো নিষ্ক্রিয় আছি।”
খবরওয়ালা/টিএসএন