খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫
অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও)-এর দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান কার্যত স্থগিত হয়ে গেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। এই দুজন হলেন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার এপিএস মো. মোয়াজ্জেম হোসেন এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের পিও তুহিন ফারাবী।
দুদকের গোয়েন্দা ইউনিট তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেলেও প্রকাশ্য অনুসন্ধান শুরু হওয়ার সাত মাস পার হয়েছে— কিন্তু দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। অনুসন্ধানের শুরুতে মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার পর দুদক কেবল তাদের তলব করেই কার্যত অনুসন্ধান থামিয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে। অথচ একই সময়ে অন্য অনেক সাবেক মন্ত্রী-সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলার পর্যায়ে পৌঁছেছে তদন্ত।
দুদকের ভেতরের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কমিশনের পুরনো আচরণই আবারও দেখা যাচ্ছে। সংস্থাটি শুরু থেকেই বিরোধীমুখী দুর্নীতির তদন্তে বেশি সক্রিয় ছিল— এখনো সেই প্রবণতা অব্যাহত।
উপদেষ্টাদের এপিএস, পিও, স্বজন ও ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা সময় দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠলেও এক বছরের বেশি সময়েও দুদক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি এক বছর আগে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া তদন্তও এখনো ঝুলে আছে। বিপরীতে গত সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে।
দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেন,“দুই উপদেষ্টার এপিএস ও পিও–এর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান এখনো চলমান। দুর্নীতির অকাট্ট প্রমাণ মেলেনি। প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “দুদক যথাসাধ্য কাজ করছে। সব ধরনের দুর্নীতি একা দুদকের পক্ষে রোধ করা সম্ভব নয়। আমরা কোনো ধরনের চাপের মধ্যে নেই এবং অভিযোগ পেলেই আইনি নিয়মে ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মঈদুল ইসলাম মন্তব্য করেন,“যে সরকার যেমনভাবে চালাতে চায়, তেমনভাবেই দুদক চলে— এটা বহুদিনের বাস্তবতা। সরকারের মর্জি-মেজাজ বুঝেই কমিশন কাজ করে। বর্তমানে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর মতো সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিবেশও নেই, অতীতেও ছিল না। এই কারণেই দুদকের এমন দুর্বল অবস্থান।”
সূত্র জানায়, মোয়াজ্জেম হোসেন ও তুহিন ফারাবীর বিরুদ্ধে বদলি ও পদোন্নতিতে ঘুষ, ক্রয়-বাণিজ্যে কমিশন এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এসব নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দুদক প্রাথমিকভাবে নড়েচড়ে বসে এবং গোয়েন্দা ইউনিট গোপনে তদন্ত শুরু করে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাদের ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করে দুদকে দেয়, যাতে অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ মেলে। প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর ৪ মে দুদক দুটি অনুসন্ধান টিম গঠন করে। পরবর্তীতে অভিযুক্তদেরসহ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়। প্রথমবার তারা হাজির না হলেও দ্বিতীয়বার দুদক কার্যালয়ে এসে জবাব দেন। এরপর থেকে তদন্তে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, “কান টানলে মাথা আসবে”— এই আশঙ্কায় তদন্ত টিম গভীরে যেতে পারছে না। তাদের কাছে ব্যাংক হিসাবের স্পষ্ট প্রমাণ থাকলেও প্রভাবশালী মহল থেকে অঘোষিত সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়েছে। উপদেষ্টাদের অগোচরে তাদের ঘনিষ্ঠ এপিএস ও পিওরা এমন দুর্নীতি করতে পারে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,“যদি দুদক প্রাথমিক প্রমাণ হাতে পেয়েও অনুসন্ধান স্থগিত রাখে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। এটি কেবল দুদকের নয়, দেশের জন্যও হতাশার বিষয়। এখনই যদি এই অবস্থা হয়, নির্বাচনের পর দলীয় সরকার এলে দুর্নীতি তদন্তের অবস্থাও আরও খারাপ হবে।”
উপদেষ্টাদের এপিএস ও পিও–এর বিরুদ্ধে তদন্তের দাবিতে যুব অধিকার পরিষদ ‘মার্চ টু দুদক’ কর্মসূচি নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে দুদক কার্যালয় পর্যন্ত পদযাত্রা করে এবং একটি স্মারকলিপি জমা দেয়। একই অভিযোগে হাইকোর্টের দুই আইনজীবীও দুদকে লিখিত আবেদন করেছিলেন। তবে অনুসন্ধানে অগ্রগতি না থাকায় এখন তাদেরও আর তেমন আগ্রহ নেই।
২২ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তার আগে দুর্নীতির অভিযোগে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের পিও তুহিন ফারাবীকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ২১ এপ্রিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকেও দল থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়— তার বিরুদ্ধেও পাঠ্যবই ছাপানোর কাগজ কেনায় কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে, দুদকের নীরবতা ও ধীরগতি আবারও প্রমাণ করছে— প্রভাবশালী মহলের দুর্নীতির ক্ষেত্রে সংস্থাটির কার্যক্রম এখনো ‘ডিপ ফ্রিজে’ই রয়ে গেছে।