খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 7শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ২১ই নভেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দেশের সরকারি স্বাস্থ্য খাতে অদক্ষতা, অনিয়ম ও অপচয় চরমে পৌঁছেছে। কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হলেও বছরের পর বছর সেগুলো ব্যবহারের বাইরে রয়ে গেছে। রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে গেলেও সেই যন্ত্রপাতি পড়ে আছে গুদাম বা হাসপাতালের কোনায় ধুলায় ঢেকে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে এসব সরঞ্জাম কেনা হলেও মানুষের সেবায় কাজে লাগছে না।
ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালে বুকে তীব্র ব্যথা নিয়ে ভর্তি হন সদর উপজেলার গৃহবধূ তাছলিমা বেগম। প্রাথমিকভাবে ইসিজি করা হলেও ইকো, এনজিওগ্রাম বা প্রয়োজনীয় সিটি স্ক্যান—কোনোটিই সেখানে করা সম্ভব হয়নি। কারণ কার্ডিওলজি বিভাগের ক্যাথ ল্যাব ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে অচল। ইকো-ইটিটিও চালু নেই।
কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা জানান, এসব পরীক্ষা ছাড়া রোগীর ধমনিতে ব্লক আছে কি না তা নিশ্চিত করা যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে তাছলিমার পরিবার বাইরে বেসরকারি ডায়াগনস্টিকে পরীক্ষা করায়, যেখানে কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় এনজিওগ্রাম না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। তাছলিমা বলেন, ‘গরিব মানুষের চিকিৎসার জায়গা নেই। হাসপাতালে মেশিন আছে, কিন্তু চালানোর মানুষ নেই।’
সরকারি হাসপাতালে এমন পরিস্থিতিতে শুধু তাছলিমা নয়, প্রতিদিন অসংখ্য হৃদরোগী চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দেখা গেছে, জনবল সংকটের কারণে প্রায় ৫৫ কোটি টাকার সরঞ্জাম বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকার ক্যাথ ল্যাব, ২৩ কোটি টাকার এমআরআই মেশিন, ৪ কোটি ৮২ লাখ টাকার ডিজিটাল এক্স-রে, সাত বছর ধরে বাক্সবন্দি রেডিওথেরাপি মেশিন, নষ্ট ইকো-ইটিটি ও অচল ইসিজি। দক্ষ টেকনিশিয়ান, কার্ডিয়াক বিশেষজ্ঞ ও রেডিওলজি অপারেটর না থাকায় এসব যন্ত্র ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের মতো গুরুতর রোগীরা সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন।
কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিস্থিতি আরও করুণ। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হয়। এর আগেই নভেম্বরে রাজনৈতিক নির্দেশে আউটডোর চালু করা হয়। কিন্তু দুই বছর পেরোলেও হাসপাতাল জনবল পায়নি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত এপ্রিলে জনবল ছাড়াই মেডিসিন ও শিশু বিভাগ চালু করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। তবে সচিবালয়ে কয়েক মাস ধরে জনবল চাহিদার ফাইল ঘুরলেও কোনো অনুমোদন মেলেনি। এদিকে হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে পড়ে নষ্ট হচ্ছে শত কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি।
জানা গেছে, গত তিন বছরে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ১৫০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও আসবাব কেনা হয়, যা এখন ভবনের ভেতরে অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন এবং অপারেশন থিয়েটারের বিভিন্ন সরঞ্জাম।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, আংশিকভাবে দুটি বিভাগে ভর্তি চলছে, তবে জরুরি বিভাগ এখনো চালু হয়নি। অন্যান্য বিভাগ কবে চালু হবে বা রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রগুলো কবে চালু হবে—এই বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেনি। প্রাথমিকভাবে মেডিসিন ও শিশু বিভাগে সর্বোচ্চ ৪৫ জন করে রোগী ভর্তি করা হচ্ছে।
জানা গেছে, জনবল নিয়োগ সংক্রান্ত ফাইল ছয় মাসের বেশি সময় ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে।
কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজের পরিচালক আনোয়ারুল কবির গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জনবল আদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। তারা জনবল দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু জনবল ছাড়া সব ওয়ার্ড ও সেবা চালু করা যাচ্ছে না। ফলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে।’
একই পরিস্থিতি জাতীয় স্নায়ুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (নিন্স) সম্প্রসারণ প্রকল্পেও। কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়েছে, কিন্তু ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পাঠানো আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন চালু হলেও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক না থাকায় আবার বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকার ম্যালেরিয়া ও আরকে-৩৯ পরীক্ষার কিট পড়ে আছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গুদামে। ত্রিশাল ও ভালুকায় পাঠানো ডিজিটাল ব্লাড গ্লুকোমিটারও চালু করা যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় টেস্ট স্ট্রিপ না থাকায়।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রোকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) ‘পোস্ট-প্রোকিউরমেন্ট রিভিউ’ প্রতিবেদনে একই চিত্র পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৯০টি চুক্তি পর্যালোচনায় দুর্নীতি, সময়ক্ষেপণ, কম প্রতিযোগিতা এবং যন্ত্রপাতি কেনার পরও অচল থাকা—এই সব অনিয়ম পাওয়া গেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো দরপত্রে প্রতিযোগিতার অভাব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৪৩ শতাংশ চুক্তি গেছে একক দরদাতার কাছে। মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে ৮৩ শতাংশ চুক্তিমূল্য। এতে বোঝা যায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মিলে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে, ফলে দাম বাড়ছে এবং সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে।
পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্য সরবরাহের আগেই পুরো টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। নথিপত্র বিশৃঙ্খল হওয়ায় অডিটররাও সঠিকভাবে যাচাই করতে পারছেন না।
সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি) আইনি কাঠামো মেনে চললেও জনবল সংকট ও নির্দিষ্ট প্রোকিউরমেন্ট সেল না থাকায় কাজের গতি খুব ধীর। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে একই সমস্যা—একই ঠিকাদারের ওপর নির্ভরতা, দুর্বল তদারকি, বাজেটের সঙ্গে অসামঞ্জস্য এবং প্রয়োজন নিরূপণ ছাড়া ক্রয়।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সাবেক সচিব মো. কামাল উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা প্রতিবেদনগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি, ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু বাস্তবতা হলো অনেক কিছু ধরা পড়লেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’
খবরওয়ালা/টিএসএন