খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ব্যবসায়িক ক্ষতির সময়ে যে বিমা সুরক্ষা মানুষের পাশে থাকার কথা, সেই সুরক্ষাই এখন অকার্যকর হয়ে পড়ছে দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে। দেশের সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলো একের পর এক দাবি জমা রাখলেও সময়মতো ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না অধিকাংশ পলিসি গ্রাহক। এতে অনেকেই পড়ছেন আর্থিক বিপর্যয় ও মানসিক অনিশ্চয়তায়।
২০২৫ সালের জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সাধারণ বিমা খাতে মোট দাবির মাত্র ৭.৫৫% নিষ্পত্তি হয়েছে। এর আগের এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে নিষ্পত্তির হার ছিল ৮.৩২%—অর্থাৎ এক প্রান্তিকেই প্রায় ৯.২৫% পতন। এ থেকে বোঝা যায়, সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, তরলতা ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক দক্ষতায় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে।
বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) অনিরীক্ষিত তথ্যানুসারে, জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোর মোট দাবি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় মাত্র ২৭৫ কোটি টাকা, ফলে প্রায় ৩ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকার দাবি প্রান্তিক শেষে অমীমাংসিত থেকে যায়।
| কোম্পানির নাম | নিষ্পত্তির হার | বকেয়া দাবি (কোটি টাকা) |
|---|---|---|
| জেনারেল ইনস্যুরেন্স করপোরেশন | ৩.৩৭% | ২,১৪২.৩৭ |
| গ্রীন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স | ৮.২৬% | ২৬৬.৫৪ |
| প্রগতি ইনস্যুরেন্স | — | ১৫৭.৯১ |
| রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স | — | ৯৮.৯১ |
| পিপলস ইনস্যুরেন্স | — | ৮০.৮০ |
জেনারেল ইনস্যুরেন্স করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রায় ৮০% বিলম্ব ঘটে জরিপ-প্রতিবেদন হাতে পেতে দেরি হওয়ায়। দুর্ঘটনার পর ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে যে জরিপ প্রতিবেদন তৈরি হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে ৫–৭ বছর পর্যন্ত বিলম্বিত হয়, বিশেষত পুনর্বিমা–সম্পর্কিত দাবি হলে। ফলে কোম্পানি বিদেশি পুনর্বিমাকারীদের সঙ্গে সময়মতো দাবি নিষ্পত্তি করতে পারে না, আর এর সরাসরি ক্ষতি পোহাতে হয় পলিসি গ্রাহকদের।
অন্যান্য কোম্পানির কর্মকর্তারাও জানান, অসম্পূর্ণ নথিপত্র—যেমন ক্ষতির প্রমাণ, পুলিশ/ফায়ার সার্ভিস প্রতিবেদন, মালিকানার কাগজ, ভাউচার বা ইনভয়েস—অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে জমা না দেওয়ায় যাচাই-বাছাই দীর্ঘ হয়। এছাড়া দাবি টাকার পরিমাণ নিয়ে বিরোধ, সালিশি প্রক্রিয়া বা আদালতের মামলায় গেলে নিষ্পত্তি আরও পিছিয়ে যায়।
আরেকটি জটিলতা হলো ‘আনইনসিউরড পেরিল’ বা পলিসিতে অন্তর্ভুক্ত নয় এমন ঝুঁকির বিপরীতে দাবি করা। রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ধীরে ধীরে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির মতো বিষয় অনেক সময় পলিসি শর্তে থাকে না। এসব ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা, মূল্যায়ন ও আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়।
খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক মন্দাই নয়, বরং দায়বদ্ধতার অভাব ও আইডিআরএ-এর দুর্বল তদারকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। নিয়ম অনুযায়ী অমীমাংসিত দাবির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অনেক কোম্পানিই দায় এড়িয়ে চলছে।
অন্যদিকে আইন অনুসারে সাধারণ বিমার ৫০% পুনর্বিমা করতে হয় রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা করপোরেশনের (এসবিসি) মাধ্যমে। কিন্তু এসবিসি নিজস্ব অংশ সময়মতো নিষ্পত্তি না করায় বেসরকারি বিমা কোম্পানিগুলোও আটকে যায়, ফলে গ্রাহকের দাবির নিষ্পত্তি বিলম্বিত হয়।
দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা গ্রাহকদের আর্থিক বিপর্যয় বাড়াচ্ছে। অনেক ব্যবসা দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের পর প্রয়োজনীয় তহবিল না পেয়ে কার্যক্রম চালাতে পারছে না। পলিসি মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পরও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার ঘটনা এখন সাধারণ হয়ে গেছে, এতে বিমা খাতে অবিশ্বাস ভয়াবহভাবে বাড়ছে।
বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাকাডেমির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, “যেখানে প্রিমিয়াম পরিশোধ করা হয়নি, সেখানে দাবি নিষ্পত্তির আশা বাস্তবসম্মত নয়। আবার ক্রমবর্ধমান আদালতের মামলাও পুরো প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছে।” তাঁর মতে, বিমাকারী, পুনর্বিমাকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং গ্রাহক—সব পক্ষের সমন্বিত কার্যক্রম ছাড়া এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
একটি তালিকাভুক্ত বিমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আইন অনুযায়ী দাবি নিষ্পত্তিতে তারা অগ্রাধিকার দেন; তবে নথিপত্র দেরিতে জমা দেওয়া, এসবিসির মাধ্যমে পুনর্বিমার দীর্ঘ প্রক্রিয়া, অতিরিক্ত সময়সাপেক্ষ ডকুমেন্টেশন—এসব কারণে অনেক সময় অনুমোদিত দাবি নিষ্পত্তিতেও মাসের পর মাস লেগে যায়।