খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
স্মরণে
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক অনন্য নাম নারায়ণ ঘোষ মিতা। তিনি একাধারে ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একনিষ্ঠ শব্দসৈনিক। শিল্প, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ—এই তিন ধারায় সমানভাবে দীপ্ত ছিল তাঁর জীবন ও কর্ম।
১৯৩২ সালের ২২ ডিসেম্বর, পুরান ঢাকার এক সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই শিল্পচেতনায় বেড়ে ওঠা এই মানুষটি পরবর্তী সময়ে দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে রেখে যান সুদৃঢ় ও স্থায়ী ছাপ।
ষাটের দশকে চলচ্চিত্র জগতে তাঁর পদার্পণ।
১৯৬৮ সালে পারিবারিক টানাপোড়েন ও মানবিক সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে নির্মাণ করেন ‘এতটুকু আশা’—যা তাঁকে একজন সংবেদনশীল নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এরও আগে গোলাম মুস্তাফা ও সুচন্দাকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘চাওয়া পাওয়া’। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই রূপালি পর্দায় শিশু শিল্পী হিসেবে অভিষেক ঘটে পরবর্তীকালের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনেত্রী এবং খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পী শুভ্রার।
১৯৬৯ সালে নির্মিত ‘নীল আকাশের নীচে’ চলচ্চিত্রে তিনি পারিবারিক বন্ধন ও মূল্যবোধকে গভীর মমতায় তুলে ধরেন।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজবাস্তবতার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে তাঁর ১৯৭৪ সালের চলচ্চিত্র ‘আলোর মিছিল’-এ, যেখানে তিনি যুদ্ধোত্তর বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম ও মানুষের হতাশাকে সাহসিকতার সঙ্গে উপস্থাপন করেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
নীল আকাশের নীচে, সাহেব, এতটুকু আশা, অলঙ্কার, সুখের সংসার, কখগঘঙ, দীপ নেভে নাই।
অভিনেতা হিসেবেও তিনি স্মরণীয়। বিশেষ করে ‘কাঁচের স্বর্গ’ চলচ্চিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় আজও দর্শকের মনে দাগ কেটে আছে।
১৯৭৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের প্রথম আসরেই তাঁর নির্মিত ‘লাঠিয়াল’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ প্রযোজক—এই দুই বিভাগে পুরস্কার অর্জন করেন, যা তাঁর সৃজনশীলতার স্বীকৃতিস্বরূপ।
পরবর্তীকালে ওপার বাংলায় পাড়ি জমালেও সেখানেও তিনি নির্মাণ করেন একাধিক রুচিসম্মত চলচ্চিত্র, রেখে যান তাঁর মেধা ও দক্ষতার সুস্পষ্ট স্বাক্ষর।
সেখানকার নাট্যাঙ্গনেও তাঁর উপস্থিতি প্রশংসিত হয়—বিশেষত ‘জল্লাদের দরবার’ নাটকে রাজু আহমেদ, আজমল হুদা মিঠু ও কল্যাণ মিত্রের সঙ্গে অভিনয় করে তিনি অর্জন করেন ভূয়সী প্রশংসা।
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় পরিচয়—
তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, যিনি অস্ত্রের পাশাপাশি কণ্ঠ ও সৃষ্টিকে ব্যবহার করেছেন মুক্তির সংগ্রামে।
অজানা এক নীরব অভিমান, বুকভরা ব্যথা ও কষ্ট নিয়ে তিনি দেশ ছেড়েছিলেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন তিন পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক।
২০০২ সালের ১ ডিসেম্বর প্রথিতযশা এই চিত্র পরিচালক আমাদের ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে
নারায়ণ ঘোষ মিতা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।