খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 8শে পৌষ ১৪৩২ | ২২ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
নতুন বছরের শুরুতেই জাতীয় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য আসতে পারে আরেকটি পরিবর্তনের খবর। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থবিভাগ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার আরও কমানোর একটি প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অর্থ উপদেষ্টার অনুমোদন মিললেই আগামী ১ জানুয়ারি থেকে নতুন এই মুনাফার হার কার্যকর হতে পারে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক পরিপত্র জারি করবে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। নতুন প্রস্তাবে গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা আগের তুলনায় কিছুটা কম সুদে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রস্তাবটি এখনো তাঁর হাতে পৌঁছায়নি। তবে তিনি স্বীকার করেন, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর স্বার্থে ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কিছুটা কমানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ এবং ব্যাংক খাতের তারল্য—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, কম অঙ্কের বিনিয়োগে তুলনামূলক বেশি মুনাফা বজায় রাখা হবে এবং বড় অঙ্কের বিনিয়োগে মুনাফার হার কমানো হবে। বিশেষ করে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বা এর কম বিনিয়োগে অপেক্ষাকৃত বেশি মুনাফা এবং এর বেশি বিনিয়োগে কম মুনাফা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ও মধ্যবিত্ত সঞ্চয়কারীরা কিছুটা সুরক্ষা পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, সরকার গত ৩০ জুন আয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার নিয়মিতভাবে পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময় গড় মুনাফার হার কিছুটা কমিয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল ছয় মাস পর আবার হার পর্যালোচনা করা হবে। সেই ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৩১ ডিসেম্বর।
আইআরডি সচিব মো. আবদুর রহমান খান বলেন, মুনাফার হার বাড়বে না কমবে—এ বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। পুরো বিষয়টি অর্থ বিভাগ দেখছে। তাদের সুপারিশ পেলেই আইআরডি পরিপত্র জারি করবে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রের মধ্যে পরিবার সঞ্চয়পত্র সবচেয়ে জনপ্রিয়। বর্তমানে বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রে প্রচলিত মুনাফার হার সংক্ষেপে নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো—
সঞ্চয়পত্রের ধরন | ৭.৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মুনাফা | ৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা
পরিবার সঞ্চয়পত্র (৫ বছর) | ১১.৯৩% | ১১.৮০%
পেনশনার সঞ্চয়পত্র | ১১.৯৮% | ১১.৮০%
বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র (৫ বছর) | ১১.৮৩% | ১১.৮০%
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র | ১১.৮২% | ১১.৭৭%
ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক (৩ বছর) | ১১.৮২% | ১১.৭৭%
তবে ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড, ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড এবং ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সাধারণ হিসাবের মুনাফার হারে আপাতত কোনো পরিবর্তন আসছে না।
এদিকে বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হার বেশি থাকলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের সঞ্চয় সরকারি তহবিলে চলে যায়। এই হার কিছুটা কমলে সেই অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরবে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই–অক্টোবর) সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকার নিট ২ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নিট ঋণ ছিল ঋণাত্মক, প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। গত অক্টোবর শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বাস্তবতায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হারে সমন্বয় সরকারের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।