খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 27শে পৌষ ১৪৩২ | ১০ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় ফেসবুকে একটি তথ্যবহুল পোস্ট শেয়ার করাটাই কাল হয়েছিল পটুয়াখালীর কলাপাড়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুসরাত জাহান সনিয়ার জন্য। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দীর্ঘ ১৪ দিন কারাবরণ, চাকরিচ্যুতি এবং সামাজিক লাঞ্ছনার যে অমানবিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি গিয়েছেন, তা স্বাধীন রাষ্ট্রের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। দীর্ঘ ৭ বছর ৪ মাস ২৩ দিনের এক দীর্ঘ লড়াই শেষে সম্প্রতি তিনি তাঁর সম্মান ও পেশা ফিরে পেয়েছেন।
সংকট ও আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট ২০১৮ সালের ৩ আগস্ট নুসরাত নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু পরামর্শমূলক পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। এর জেরে ৪ আগস্ট মধ্যরাতে তাঁকে নিজ বাসা থেকে আটক করা হয়। ৫ আগস্ট তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ (২) ধারায় মামলা দিয়ে ৬ আগস্ট তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অথচ সে সময় তিনি ছিলেন সন্তানসম্ভবা। থানায় ১২ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা, শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও মানসিক নির্যাতন এবং পটুয়াখালী জেলা কারাগারে সাধারণ কয়েদিদের মতো মেঝেতে রাত কাটানোর দুঃসহ স্মৃতি আজও তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়।
নুসরাত জাহানের এই দীর্ঘ সংগ্রামের একটি সংক্ষিপ্ত কালপঞ্জি নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্য ও ঘটনার সময়কাল |
|---|---|
| গ্রেপ্তারের কারণ | ২০১৮ সালের ৩ আগস্ট ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করা। |
| গ্রেপ্তারের সময় অবস্থা | সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা (চিকিৎসাধীন)। |
| কারাবাসের সময়কাল | ১৪ দিন (পটুয়াখালী জেলা কারাগার)। |
| মামলার ধারা | আইসিটি আইনের ৫৭ (২) ধারা (তৎকালীন বিতর্কিত আইন)। |
| চাকরি থেকে বরখাস্ত | ৬ আগস্ট ২০১৮ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত। |
| আইনি সহায়তা | বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। |
| মামলা থেকে অব্যাহতি | ২২ মে ২০২৫ (হাইকোর্ট কর্তৃক মামলা বাতিল)। |
| কাজে যোগদান | ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ (বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার)। |
মানসিক পীড়ন ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর নুসরাতের লড়াই শেষ হয়নি। বরখাস্ত হওয়ার কারণে নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়, যা তাঁকে এবং তাঁর ব্যবসায়ী স্বামী আনোয়ার হোসেনকে চরম আর্থিক ও মানসিক অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়। সমাজের মানুষের বাঁকা চাহনি এবং ‘অপরাধী’ তকমা ঘুচাতে দীর্ঘ সময় তিনি নিজেকে ঘরবন্দী করে রেখেছিলেন। এমনকি কারাগারের ভেতরেও তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তাদের জেরা ও স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা ছিল অত্যন্ত অমানবিক।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ব্লাস্টের আইনজীবীদের সহায়তায় দীর্ঘ সাত বছর আইনি লড়াই চালানোর পর হাইকোর্ট নুসরাতের বিরুদ্ধে করা মামলার কার্যক্রম বাতিল করেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা আইনের অপব্যবহার করেছেন। কারণ, অভিযোগপত্র দাখিলের সময় সংশ্লিষ্ট আইনটিই রহিত হয়ে গিয়েছিল। ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, “এটি একটি ভিত্তিহীন মামলা ছিল। নুসরাত যে মানসিক ও পেশাগত ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তার জন্য রাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নুসরাতের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর তিনি পুনরায় চাকরিতে বহাল হন এবং ওই সময়ের বকেয়া বেতন-ভাতা ফিরে পাওয়ার অধিকার লাভ করেন। বর্তমানে নুসরাত কলাপাড়ার দক্ষিণ টিয়াখালী (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত। তাঁর সেই গর্ভস্থ সন্তান এখন সাত বছরের শিশু, যে বড় হয়ে তাঁর মায়ের কাছে জানতে চায়—কেন তাকে পেটে রেখেই মাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল? নুসরাতের এই ফিরে আসা কেবল একটি চাকরির পুনরুদ্ধার নয়, এটি একটি ন্যায়বিচারের জয়।