খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
পৌষ সংক্রান্তিকে ঘিরে ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসবে আবারও রঙিন আনন্দে মেতে উঠেছে পুরান ঢাকা। বাসাবাড়ির ছাদ, সরু অলিগলি, বাজার আর বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী জনপদজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের উচ্ছ্বাস। ঘুড়ির সুতা, নাটাই আর রঙিন ঘুড়ির কেনাবেচায় মুখর হয়ে উঠেছে শাঁখারীবাজার, লক্ষ্মীবাজার, নয়াবাজার, তাঁতীবাজার, গেন্ডারিয়া, ধূপখোলা ও সূত্রাপুর এলাকা। সারি সারি বাড়ির ছাদে আলোকসজ্জা, রঙিন ফানুস আর দিনের বেলায় ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা জানান দিচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন এই উৎসবের আগমন।
সাকরাইন পুরান ঢাকার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক। প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষ দিনে এ উৎসব পালিত হয়। দিনভর শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ ও বয়স্ক—সব বয়সী মানুষ ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দে অংশ নেন। ঘুড়ি কাটাকাটির প্রতিযোগিতা, দল বেঁধে ছাদে আড্ডা আর হাসি-ঠাট্টায় মুখর থাকে আকাশ আর চারপাশ। সন্ধ্যা নামতেই আতশবাজি ও ফানুসের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ঢাকার আকাশ। অনেক বাড়িতে রাতভর চলে সাংস্কৃতিক আয়োজন, যদিও অতিরিক্ত শব্দের কারণে একাংশ বাসিন্দা বিরক্তি প্রকাশ করছেন।
কোতোয়ালি থানার আওতাধীন এলাকায় বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সাকরাইন উৎসব ঘিরে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। থানার অফিসার ইনচার্জ মনিরুজ্জামান জানান, ডিএমপির নির্দেশনা অনুযায়ী উচ্চ শব্দে গান বাজানো ও রাতভর লাউড স্পিকার ব্যবহার নিষিদ্ধ। দুর্ঘটনা এড়াতে ও জনদুর্ভোগ কমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
ব্যবসায়ীরাও খুশি। শাঁখারীবাজারের ঘুড়ি বিক্রেতা জগদীশ জানান, গত বছরের তুলনায় এবার বিক্রি ভালো। বিশেষ করে বড় ও রঙিন ঘুড়ির চাহিদা বেশি। নয়াবাজারের নাটাই ও সুতা বিক্রেতা জয় বলেন, সুতা কিছুটা দামি হলেও মানজা সুতার চাহিদা তুঙ্গে, কারণ কাটাকাটির মজাই সাকরাইনের মূল আকর্ষণ।
স্থানীয় বাসিন্দা পলক বলেন, “প্রতি বছর সাকরাইনে পরিবার নিয়ে ছাদে ঘুড়ি ওড়াই। এবার বাচ্চা-বড় মিলিয়ে ৩০টা ঘুড়ি কিনেছি।” আবার স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা জানায়, বন্ধুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘুড়ি কাটাকাটিতেই তাদের সবচেয়ে বেশি আনন্দ।
তবে দিনভর ঘুড়ি উৎসবের পর রাতের ডিজে ও নাইট পার্টিকে অনেকেই অপসংস্কৃতি হিসেবে দেখছেন। তারা চান, ঐতিহ্য বজায় রেখে উৎসব হোক শৃঙ্খলার মধ্যেই।
উল্লেখ্য, সংস্কৃত শব্দ ‘সংক্রান্তি’ ঢাকাইয়া অপভ্রংশে ‘সাকরাইন’ নামে পরিচিত। বাংলা ক্যালেন্ডার ও পঞ্জিকার তারিখগত পার্থক্যের কারণে পুরান ঢাকায় অনেক সময় দুই দিনব্যাপী এই উৎসব পালিত হয়। যদিও এটি মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব, তবে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এতে অংশ নিয়ে একে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত করেছে।
সাকরাইন উৎসবের সংক্ষিপ্ত চিত্র
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| উপলক্ষ | পৌষ সংক্রান্তি |
| প্রধান আয়োজন | ঘুড়ি ওড়ানো, কাটাকাটি |
| জনপ্রিয় এলাকা | শাঁখারীবাজার, লক্ষ্মীবাজার, নয়াবাজার |
| সন্ধ্যার আয়োজন | ফানুস, আতশবাজি |
| প্রশাসনিক নির্দেশনা | উচ্চ শব্দে গান নিষিদ্ধ |
রঙিন আলো, ঘুড়ির নাচন আর মানুষের উচ্ছ্বাসে সাকরাইন আবারও প্রমাণ করছে—পুরান ঢাকার প্রাণের উৎসব আজও অমলিন।