খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
ইরানে দীর্ঘ সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও পরবর্তী সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশটির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন। তাঁর মতে, বিক্ষোভের আড়ালে ‘সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র দাঙ্গাবাজেরা’ নিরীহ নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোয় এই বিপুল প্রাণহানি ঘটেছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানের অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। তবে দ্রুতই তা রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং বিক্ষোভকারীরা সরাসরি সরকারের পদত্যাগের দাবি জানাতে শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৮ জানুয়ারি দেশটির সরকার ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় এবং রাস্তায় বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে সে সময় প্রকৃত হতাহতের খবর বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাতে পারেনি। উত্তর-পশ্চিম ইরানের কুর্দিশ অঞ্চলে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে, যেখানে নিহতের সংখ্যা সর্বাধিক।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির জন্য সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন। তেহরানের দাবি, বিক্ষোভকারীদের উস্কানি দিতে এবং অস্ত্র সরবরাহ করতে বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, বিদেশি অপরাধীদের এই ধৃষ্টতা বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই দমন-পীড়নের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, তেহরানের বর্তমান শাসকদের বিদায়ের সময় হয়েছে এবং দেশটিতে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন।
ইরানে বিক্ষোভ ও হতাহতের বর্তমান পরিসংখ্যান:
| বিষয় | বিবরণ ও উপাত্ত |
| মোট নিহতের সংখ্যা | ৫,০০০ জন (সরকারি সূত্র মতে) |
| নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মৃত্যু | ৫০০ জন |
| গ্রেপ্তারকৃত নাগরিকের সংখ্যা | ২৪,০০০ জনের বেশি |
| সবচেয়ে সহিংস অঞ্চল | উত্তর-পশ্চিম কুর্দিশ এলাকা |
| মানবাধিকার সংস্থার তথ্য (HRANA) | ৩,৩০৮ জন নিশ্চিত মৃত্যু; ৪,৩৮২ জন যাচাইধীন |
| বিক্ষোভ শুরুর তারিখ | ২৮ ডিসেম্বর |
| ইন্টারনেট বন্ধের তারিখ | ৮ জানুয়ারি |
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ দমনের সময় তেহরান প্রশাসন ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে, গ্রেপ্তারকৃতদের অনেকেই বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা বা নির্বাসিত রাজপরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, নাজানিন বারাদারান নামের এক নারীর বিরুদ্ধে ক্ষমতাচ্যুত শাহ পাহলভির ছেলের নির্দেশে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও বর্তমানে বিক্ষোভের তীব্রতা কিছুটা কমেছে এবং তেহরান জানিয়েছে তারা গ্রেপ্তারকৃতদের মৃত্যুদণ্ড দেবে না, তবুও জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ইরানের এই বিক্ষোভ দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ জনরোষ—এই দ্বিমুখী সংকটে তেহরান প্রশাসন এখন দিশেহারা। ৫ হাজার মানুষের প্রাণহানি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি ইরানের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার এক ভয়াবহ দলিল। শান্তি পুনরুদ্ধারের জন্য দমন-পীড়নের পরিবর্তে সংলাপের পথ বেছে নেওয়া হবে কি না, তা-ই এখন দেখার বিষয়।