বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে একটি মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানার দুই ছাত্রীকে প্রলোভন ও কৌশলে কক্সবাজারের একটি হোটেলে নিয়ে গিয়ে পৈশাচিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। লোহমর্ষক এই ঘটনায় জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত আয়াত উল্লাহকে (৪৩) দ্রুততম সময়ের মধ্যে আটক করতে সক্ষম হয়েছে। ভুক্তভোগী দুই শিশু বর্তমানে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও অপহরণের বিবরণ
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি, ২০২৬) রাত ৯টার দিকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলাধীন একটি মহিলা মাদ্রাসা থেকে কৌশলে বের করে আনা হয় ওই দুই সহোদরাকে। অভিযুক্ত আয়াত উল্লাহ মাদ্রাসা ও এতিমখানার দুই ছাত্রীকে রূপনগর এলাকা দিয়ে একটি অটোরিকশায় করে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কক্সবাজার শহরের একটি অপরিচিত হোটেলে নিয়ে গিয়ে তিনি দুই বোনের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালান বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্যাতনের শিকার বড় বোন বর্তমানে ১৬ পারা হেফজ সম্পন্ন করেছেন এবং ছোট বোন নাজেরা বিভাগে অধ্যয়নরত।
অভিযুক্তের পরিচয় ও পুলিশের তৎপরতা
অভিযুক্ত আয়াত উল্লাহ স্থানীয় কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের মৌলভীকাটা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ফেরদাউসের ছেলে। ঘটনার পরদিন বুধবার বিকেলে নাইক্ষ্যংছড়ি থানা পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও বর্তমান অবস্থা:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| ঘটনার স্থান | কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেল। |
| ঘটনার সময় | ২০ জানুয়ারি ২০২৬, মঙ্গলবার রাত ৯টার পর। |
| অভিযুক্তের নাম ও বয়স | আয়াত উল্লাহ (৪৩)। |
| ভুক্তভোগীদের পরিচয় | দুই বোন (মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্রী)। |
| আটক ও আইনি ব্যবস্থা | অভিযুক্ত আটক, নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় মামলা দায়ের। |
| ভুক্তভোগীদের বর্তমান অবস্থা | মানসিক ও শারীরিক ট্রমার মধ্যে চিকিৎসাধীন। |
পরিবারের আহাজারি ও বিচার দাবি
ভুক্তভোগীদের অসহায় মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তাঁর কন্যারা মাদ্রাসায় নিরাপদে পড়াশোনা করছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তি তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিয়েছে। ঘটনার পর থেকে দুই বোন মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং কারো সাথে কথা বলতে পারছে না। তিনি সমাজের কাছে এবং প্রশাসনের কাছে এই ঘৃণ্য অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, যেন ভবিষ্যতে কেউ এতিম ও অসহায় শিশুদের ওপর এমন হাত বাড়াতে সাহস না পায়।
প্রশাসনের বক্তব্য
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল বাতেন মৃধা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “আমরা সংবাদ পাওয়ার পরপরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তকে আটক করেছি। ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।” তিনি আরও জানান যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে এবং অপরাধীকে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলছে।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া
মাদ্রাসা ও এতিমখানার মতো পবিত্র স্থান থেকে ছাত্রীদের তুলে নিয়ে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজার এলাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় আলেম সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন।
উপসংহার
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। মাদ্রাসা পড়ুয়া দুই ছাত্রীর ওপর এমন পৈশাচিক নির্যাতন আমাদের নৈতিক অবক্ষয়েরই একটি চিত্র। অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হলেও, ভুক্তভোগীদের সামাজিক ও মানসিক পুনর্বাসন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা এই অসহায় পরিবারটিকে ন্যায়বিচার পেতে সাহায্য করবে—এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।



