খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে রহস্যজনকভাবে এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এলাকা। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি, ২০২৬) সকালে পৌরসভার নওপাড়া গ্রামে অবস্থিত ‘আলোর দিশা’ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, নিরাময় কেন্দ্রের কর্মীদের বেধড়ক পিটুনিতে রাজ্জাক মাতুব্বর (২৮) নামের ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং ক্ষোভে কেন্দ্রের ভেতরে আটকে থাকা রোগীরা দরজা ভেঙে বেরিয়ে এসে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
নিহত রাজ্জাক মাতুব্বর ভাঙ্গা পৌরসভার হাসামদিয়া গ্রামের সামাদ মাতুব্বরের ছেলে। পরিবারের ভাষ্যমতে, রাজ্জাক মাদকাসক্ত হওয়ায় তাকে সংশোধনের আশায় গত মঙ্গলবার রাতে ‘আলোর দিশা’ কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল। ভর্তির মাত্র তিন দিন পরেই শুক্রবার সকালে কেন্দ্র থেকে পরিবারকে জানানো হয় রাজ্জাক ‘সামান্য অসুস্থ’। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে গিয়ে রাজ্জাকের নিথর মরদেহ দেখতে পান। নিহতের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন এবং নাক-কান দিয়ে রক্তক্ষরণ হতে দেখে স্বজনরা দাবি করেন যে, তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারণী ও বর্তমান চিত্র:
| তথ্যের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| নিহত ব্যক্তি | রাজ্জাক মাতুব্বর (বয়স আনুমানিক ২৮-৩০)। |
| নিরাময় কেন্দ্রের নাম | আলোর দিশা মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। |
| ভর্তির তারিখ | ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ (মঙ্গলবার রাত)। |
| মৃত্যুর তারিখ | ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ (শুক্রবার সকাল)। |
| রোগীর সংখ্যা (উদ্ধারকৃত) | ৫১ জন (তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে)। |
| গৃহীত আইনি ব্যবস্থা | কেন্দ্রটি সিলগালা করা হয়েছে এবং ময়নাতদন্ত চলমান। |
| বর্তমান পরিস্থিতি | কেন্দ্রের মালিক ও কর্মীরা পলাতক। |
রাজ্জাকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ শুরু করলে কেন্দ্রের ভেতরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী ভেতরে তালাবদ্ধ থাকা অবস্থায় বিদ্রোহ শুরু করেন। তাঁরা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে কেন্দ্রের প্রধান ফটক ও জানালার কাচ ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসেন। বিক্ষুব্ধ রোগীরা কেন্দ্রের আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ভাঙচুর করেন। তাঁদের অভিযোগ, চিকিৎসার নামে সেখানে রোগীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো।
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আলীম জানান, মরদেহের প্রাথমিক সুরতহালে পিটিয়ে হত্যার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা গেছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে কেন্দ্রের ভেতরে থাকা ৫১ জন রোগীকে উদ্ধার করে তাঁদের হেফাজতে নিয়েছে। জেলা মাদক নিরাময় কেন্দ্র ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের উপপরিচালক শিরিন আক্তার এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদরুল আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার পরপরই কেন্দ্রের মালিক মিজানুর রহমানসহ সকল কর্মচারী পালিয়ে গেছেন। অনিয়ম ও সহিংসতার অভিযোগে ‘আলোর দিশা’ কেন্দ্রটি তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশি হেফাজতে থাকা রোগীদের তাঁদের নিজ নিজ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রাজ্জাক মাতুব্বরের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং সেই অনুযায়ী হত্যা মামলা দায়ের করা হবে। পুলিশ পলাতক মালিক ও কর্মচারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করছে।
মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর সেবার মান এবং সেখানে রোগীদের সাথে আচরণের বিষয়টি এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও বড় ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হলো। নিরাময় কেন্দ্রগুলো যদি নির্যাতনের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি নষ্ট হয়ে যাবে। রাজ্জাক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং লাইসেন্সবিহীন ও অনিয়মিত কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রধান দাবি।