খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এক বড় ধরনের একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের (M&A) প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাকিস্তানভিত্তিক ব্যাংক আলফালাহর বাংলাদেশ অংশের যাবতীয় সম্পদ ও দায় অধিগ্রহণের প্রস্তাবনা অনুমোদনের লক্ষ্যে বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আহ্বান করেছে বেসরকারি খাতের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ব্যাংক এশিয়া। দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। মূলত কৌশলগত বিনিয়োগ এবং বিশেষ করে ইসলামি ব্যাংকিং সেবাকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যেই ব্যাংক এশিয়া এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
ব্যাংক এশিয়া তাদের পর্ষদ সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে ১৩তম বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন এবং সাধারণ শেয়ারধারীদের সম্মতির ভিত্তিতেই এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
| বিষয় | নির্ধারিত তথ্য |
| সভার ধরন | ১৩তম বিশেষ সাধারণ সভা (EGM) |
| সভার তারিখ | ১২ এপ্রিল |
| সময় ও মাধ্যম | সকাল ১১টা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম |
| রেকর্ড ডেট | ২৬ ফেব্রুয়ারি |
| উদ্দেশ্য | ব্যাংক আলফালাহর সম্পদ ও দায় অধিগ্রহণের প্রস্তাব অনুমোদন |
ব্যাংক এশিয়া এবং ব্যাংক আলফালাহর মধ্যে এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল গত বছরের ২৮ মে, যখন দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে পাকিস্তানভিত্তিক ব্যাংক আলফালাহর পরিচালনা পর্ষদ তাদের বাংলাদেশের কার্যক্রম বিক্রির বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন প্রদান করে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং ব্যাংক আলফালাহর প্রকৃত সম্পদের মূল্য নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অডিট প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস (PWC) বাংলাদেশ বর্তমানে ব্যাংক আলফালাহর নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়াও আরও দুটি নিরীক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছে। প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই অধিগ্রহণ সম্পন্ন করতে ব্যাংক এশিয়ার প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যাংক এশিয়া ১৯৯৯ সালে কার্যক্রম শুরু করার পর থেকেই দেশের আর্থিক খাতে উদ্ভাবনী সেবার জন্য পরিচিত। বিদেশি ব্যাংক অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংক এশিয়ার অভিজ্ঞতা বেশ পুরনো এবং সফল। এর আগেও তারা দুটি বিদেশি ব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যক্রম নিজেদের অধীনে নিয়েছিল:
১. কানাডাভিত্তিক নোভা স্কোটিয়া (Bank of Nova Scotia)
২. পাকিস্তানভিত্তিক মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক (MCB)
এই তৃতীয় দফার অধিগ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংক এশিয়া মূলত তাদের ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডোকে আরও শক্তিশালী করতে চায়। ব্যাংক আলফালাহর একটি বড় গ্রাহক ভিত্তি রয়েছে যারা ইসলামি শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করেন। ব্যাংক এশিয়া চায় প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকিং সেবায় শীর্ষস্থান দখল করতে।
উল্লেখ্য যে, ব্যাংক আলফালাহর বাংলাদেশ শাখা কেনার দৌড়ে ব্যাংক এশিয়া একাই ছিল না। এর আগে শ্রীলঙ্কার হাটন ন্যাশনাল ব্যাংক (HNB) এই সম্পদ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হাটন ন্যাশনাল ব্যাংককে আলফালাহর হিসাব ও কার্যক্রম খতিয়ে দেখার (Due Diligence) অনুমতিও দিয়েছিল। তবে দীর্ঘ পর্যালোচনার পর শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কান ব্যাংকটি তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এই প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়। এরপরই ব্যাংক এশিয়া অত্যন্ত জোরালোভাবে এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় এবং সফলতার পথে অগ্রসর হয়।
এই অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে ব্যাংক এশিয়ার আমানত ও ঋণের পোর্টফোলিও যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি শাখা ও নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রাহকসেবার পরিধিও অনেক বেড়ে যাবে। দেশের আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিদেশি ব্যাংকের প্রস্থান এবং দেশীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধির এই নজিরকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।