খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 23শে মাঘ ১৪৩২ | ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ফ্রান্সের টেলিভিশন চ্যানেল ফ্রান্স ২-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার এই বক্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত এই ৫৫ হাজার সেনার মধ্যে পেশাদার সেনাসদস্যদের পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্যরাও রয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি ইউক্রেনের সরকারি ও যাচাইকৃত হিসাব, যা যুদ্ধক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে নিহত সেনাদের সংখ্যা নির্দেশ করে। তবে এই সংখ্যার বাইরেও বিপুলসংখ্যক সেনা এখনও নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে, যাদের ভাগ্য অনিশ্চিত। অনেক ক্ষেত্রে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ হলেও নিহত বা আটক—কোনো অবস্থাই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
যুদ্ধের সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক-ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) একটি বিশদ মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের সূচনা থেকে ২০২৬ সালের বসন্ত পর্যন্ত উভয় পক্ষ মিলিয়ে মোট সামরিক হতাহত, আহত ও নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছাতে পারে। এই পরিসংখ্যান যুদ্ধের ব্যাপকতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
সিএসআইএস-এর হিসাবে, রাশিয়ার প্রায় ১২ লাখ সেনা এই যুদ্ধে হতাহত হয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের ক্ষেত্রে হতাহতের সংখ্যা আনুমানিক ৫ থেকে ৬ লাখের মধ্যে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর প্রায় চার বছরে রাশিয়ার প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার সেনা নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও উভয় পক্ষের সরকারি হিসাব ও স্বাধীন বিশ্লেষণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে প্রাণহানির মাত্রা যে নজিরবিহীন, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তেমন কোনো দ্বিমত নেই।
এই যুদ্ধ শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, বেসামরিক জনগণের জীবনেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৫ সালে ইউক্রেনে বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে, শুধু ২০২৫ সালেই অন্তত ২ হাজার ৫০০ বেসামরিক মানুষ নিহত এবং ১২ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, বাস্তব সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রের অনেক অঞ্চল থেকে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন।
নিচের সারণিতে বিভিন্ন উৎসের তথ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধের প্রাণহানি ও হতাহতের একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| পক্ষ / শ্রেণি | নিহত সেনা (আনুমানিক) | মোট হতাহত (নিহত, আহত ও নিখোঁজ) |
|---|---|---|
| ইউক্রেন | ৫৫,০০০ | ৫–৬ লাখ |
| রাশিয়া | ৩,২৫,০০০ | প্রায় ১২ লাখ |
| বেসামরিক (২০২৫) | ২,৫০০+ | ১৪,৫০০+ |
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, বরং একটি প্রজন্মের ওপর যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের প্রতিচ্ছবি। অবকাঠামো ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি, মানসিক ট্রমা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে এই প্রাণহানি ইউক্রেন ও গোটা অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।