খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নরেন্দ্র মোদি সরকারের কূটনৈতিক ভারসাম্য নীতির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান ও বাণিজ্যিক শর্ত, অন্যদিকে বহু দশকের কৌশলগত অংশীদার রাশিয়ার সঙ্গে গভীর জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা—এই দ্বিমুখী চাপে দিল্লির সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন কঠিন সমীকরণে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ঘিরে ট্রাম্পের মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দেয়। তাঁর দাবি, চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাতে বা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। তবে এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ স্পষ্ট করে বলেন, ভারত কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল নয় এবং দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে আসছে। রাশিয়ার কাছে ভারতের পক্ষ থেকে রুশ তেল কেনা বন্ধের কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা পৌঁছেনি। মস্কোর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে—ভারতের জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তন এলেও তা রাশিয়াকে বাদ দিয়ে নয়, বরং উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সুযোগে রাশিয়া ভারতকে উল্লেখযোগ্য ছাড়ে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করছে। এর ফলে ভারতের আমদানি ব্যয় কমেছে এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকার সুবিধা পেয়েছে। বর্তমানে ভারতের দৈনিক আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রাশিয়া থেকে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ এবং রুশ জ্বালানি বর্জনের আহ্বান দিল্লির ওপর কৌশলগত চাপ বাড়িয়েছে। তবু ভারত প্রকাশ্যে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতির কথা বলে আসছে—যার মূল কথা, কোনো একটি শক্তির প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এই তেল বাণিজ্যকে উভয় দেশের জন্য লাভজনক ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ভারত–রাশিয়া জ্বালানি সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় থাকে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও হঠাৎ করে রুশ তেল বর্জন করা ভারতের জন্য সহজ নয়। রাশিয়ার ‘ইউরালস’ গ্রেডের অপরিশোধিত তেল তুলনামূলকভাবে ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ; ভারতীয় শোধনাগারগুলো বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের তেল প্রক্রিয়াজাত করার উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের তেল তুলনামূলক হালকা। শোধনাগারের প্রযুক্তি ও মিশ্রণ বদলাতে বড় বিনিয়োগ ও সময় প্রয়োজন, যা স্বল্পমেয়াদে ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়াবে।
নিচের সারণিতে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রধান উৎস ও বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| উৎস দেশ/অঞ্চল | আমদানির আনুমানিক অংশ | তেলের ধরন | ভারতের জন্য সুবিধা |
|---|---|---|---|
| রাশিয়া | ৩০–৩৫% | ভারী, সালফারসমৃদ্ধ (ইউরালস) | ছাড়ে সরবরাহ, শোধনাগারের উপযোগিতা |
| মধ্যপ্রাচ্য (ইরাক, সৌদি আরব) | ৪০–৪৫% | মধ্যম থেকে ভারী | ভৌগোলিক নিকটতা, স্থিতিশীল সরবরাহ |
| যুক্তরাষ্ট্র | ৫–১০% | হালকা | বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, কূটনৈতিক ভারসাম্য |
| অন্যান্য | ১০–১৫% | মিশ্র | ঝুঁকি বণ্টন |
সব মিলিয়ে, মোদি সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জটি কেবল তেল কেনাবেচার নয়; এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর করা যেমন ভারতের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা হঠাৎ ছিন্ন করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই দিল্লির কৌশল সম্ভবত হবে ধীরে ধীরে উৎস বৈচিত্র্য বাড়ানো, কিন্তু কোনো একক অংশীদারকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে—যাতে অর্থনৈতিক স্থিতি ও কূটনৈতিক স্বাধীনতা দুটিই রক্ষা পায়।