খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে একটি প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের প্রত্যাশায় থাকা তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি (যাদের জন্ম ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে), এবার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই নির্বাচনকে ‘বিশ্বের প্রথম জেন-জি প্রভাবিত নির্বাচন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যা ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্ধাংশ তরুণ প্রজন্ম। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৃহৎ ভোটার গোষ্ঠী যেদিকে ঝুঁকে পড়বে, ক্ষমতার পাল্লা সেদিকেই ভারী হবে। অতীতে রাজনৈতিক দলগুলো মূলত বংশপরম্পরায় বা পারিবারিক পরিচয়ে জনসমর্থন পেত। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তরুণরা এখন রাজনৈতিক অন্ধত্বের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাঁদের নীতি ও পরিকল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
| বিষয় | বিস্তারিত প্রভাব ও পর্যবেক্ষণ |
| ভোটার শক্তি | মোট ভোটারের প্রায় ২৫ শতাংশই জেন-জি বা তরুণ ভোটার। |
| তথ্যের উৎস | ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের ভিডিও এবং ইনফোগ্রাফিকস। |
| সিদ্ধান্ত গ্রহণ | পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ভেঙে নিজস্ব বিবেচনাবোধের প্রয়োগ। |
| দলীয় সমীকরণ | বিএনপি ও জামায়াত জোটের শক্ত অবস্থান; এনসিপি-র কৌশলগত পরিবর্তন। |
| বৈশ্বিক প্রভাব | দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের কৌশলগত আধিপত্যের ওপর ফলাফলের প্রভাব। |
এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক এক বিশাল ভূমিকা পালন করছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ বিভাগের শিক্ষার্থী ওয়াসেক হোসেন জানান, ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে তরুণ ভোটারদের সামনে বিভিন্ন ভিডিও এবং তথ্যচিত্রের মাধ্যমে প্রার্থীরা নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরছেন। জেন-জিরা মূলত স্ক্রল করতে করতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছেন। বিভিন্ন অনলাইন জরিপও তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে। তবে ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো ‘অনির্ধারিত’ হিসেবে থেকে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তের ডিজিটাল প্রচারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, তরুণদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিবর্তন নিয়ে বারডেম মেডিকেল থেকে পাস করা ডা. জিয়াউল হাসান বলেন, “আগে আমাদের বাবা-মা যে দলকে সমর্থন করতেন, আমরাও অনেকটা মানসিকভাবে সেই দলের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতাম। কিন্তু এবার আমরা পরিবারের প্রথাগত সমর্থন থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের চিন্তাভাবনা ও বিবেক ব্যবহার করছি। নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারার এই পরিবেশ তৈরি হওয়াটাই গণআন্দোলনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।”
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পাল্লা ভারী মনে হলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে, গণঅভ্যুত্থানের ফসল হিসেবে পরিচিত তরুণদের দল এনসিপি (নিউ জেনারেশন পার্টি) এককভাবে নিজেদের আন্দোলনকে ভোটে রূপান্তর করতে না পেরে জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিশাত তাসনীম মনে করেন, এনসিপির এই কৌশলগত পরিবর্তন অনেক তরুণকে হতাশ করলেও নতুন ভোটাররা শেষ পর্যন্ত দেশের স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি মাথায় রেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
বাংলাদেশের এই নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের কৌশলগত প্রভাবের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের এই জেগে ওঠা এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সচেতনতা ভবিষ্যতে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে। জেন-জি ভোটারদের এই নীরব বিপ্লবই বলে দেবে আগামীর বাংলাদেশ কার হাতে নিরাপদ।