খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এখন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সম্প্রতি ইরানের সামরিক সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, যেকোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে। তেহরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যেকোনো ধরণের ‘দুঃসাহসিকতা বা বোকামির’ সমুচিত জবাব দিতে ইরান সামরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
ইরানি সামরিক বাহিনীর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে এবং তারা বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখছে না। তেহরান অভিযোগ করেছে যে, আন্তর্জাতিক আইন কিংবা পূর্ববর্তী কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রতি ওয়াশিংটনের শ্রদ্ধাশীল আচরণের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ তারা পাচ্ছে না। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তারা বিভিন্ন সময়ে আলোচনার টেবিলে নমনীয়তা প্রদর্শন করলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইতিবাচক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বরং ইরান যখনই তাদের শর্ত শিথিল করেছে, ওয়াশিংটন তখনই নতুন করে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে একটি শান্তি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই সময় ইরান তাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি থেকে সরে এসেছিল, যার মধ্যে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের মতো সংবেদনশীল বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। বর্তমানে ইরানের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট; তারা পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়ে আলোচনার আগে দুটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সমাধান দাবি করছে:
১. হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
২. ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ প্রত্যাহার।
নিচে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান উত্তেজনার কিছু মূল ফ্যাক্ট ও প্রেক্ষাপট টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিবরণ ও বর্তমান অবস্থা |
| মূল বিরোধের কারণ | পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালেস্টিক মিসাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার। |
| হরমুজ প্রণালি | বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০% এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়; ইরান এখানে নিয়ন্ত্রণের হুমকি দিয়েছে। |
| নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) | ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে ইরানের ওপর পুনরায় কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করা হয়েছে। |
| পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) | ২০১৫ সালের চুক্তিতে ইরান ও ছয়টি দেশ সই করলেও ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে বেরিয়ে যায়। |
| সামরিক প্রস্তুতি | ইরান তাদের ড্রোন প্রযুক্তি ও মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি করেছে। |
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই কূটনৈতিক ও সামরিক অচলাবস্থা কাটানোর কোনো লক্ষণ আপাতত দৃশ্যমান নয়। একদিকে ওয়াশিংটন চাইছে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে এনে আরও কঠোর শর্ত আরোপ করতে, অন্যদিকে তেহরান শর্তহীন অবরোধ প্রত্যাহার এবং সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি ছাড়া কোনো সমঝোতায় যেতে নারাজ। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে।
ইরানের সামরিক সদর দপ্তর পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে, তাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। যদি মধ্যপ্রাচ্যে কোনো ধরণের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তবে ইরান তার পূর্ণ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে পাল্টা আঘাত হানবে। এই উত্তেজনা নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও, উভয় পক্ষের অনড় অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক ইস্যুই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দু।