খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড বা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হওয়ার পর, দীর্ঘ ২৭ বছর পর নিজের সন্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিলেন এক প্রবাসী পিতা। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার চট্টগ্রাম কার্যালয়ে এই ঐতিহাসিক ও আইনি পুনর্মিলন ঘটে। বিজ্ঞ আদালতের সুনির্দিষ্ট আদেশে সম্পন্ন হওয়া বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ওই ব্যক্তি তাঁর প্রথম পক্ষের সন্তানকে নিজের আইনগত উত্তরাধিকারী হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার এক প্রবাসী ব্যক্তি তাঁর নিজ প্রতিবেশী এক নারীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তবে দাম্পত্য জীবনের অল্প কিছুদিনের মাথায় এবং সন্তান পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র কলহ ও বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি তাঁর গর্ভবতী স্ত্রীকে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক দিয়ে পুনরায় বিদেশে চলে যান। পিতার প্রবাসে অবস্থানের সময়েই ওই নারীর কোল আলো করে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। পিতার স্নেহবঞ্চিত এই শিশুটি পরবর্তীতে তার মাতুলালয়ে বা মামার বাড়িতে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে বড় হতে থাকে। দীর্ঘদিন পর ওই প্রবাসী ব্যক্তি বিদেশ থেকে পাকাপাকিভাবে দেশে ফিরে আসেন এবং দ্বিতীয় বিবাহ করে স্বদেশে নতুন সংসার শুরু করেন।
পুত্রসন্তানটি বড় হওয়ার পর তার বাবার এই দেশে অবস্থানের কথা জানতে পারে এবং একটিবারের জন্য হলেও ‘বাবা’ বলে ডাকার আকুলতা নিয়ে প্রবাসীর মুখোমুখি হয়। সে তার ন্যায্য পিতৃপরিচয় ও সামাজিক স্বীকৃতি দাবি করে। তবে ওই ব্যক্তি তাকে নিজের সন্তান হিসেবে মেনে নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়টি ঝুলে থাকায় এবং কোনো সমাধান না পেয়ে, যুবকটি অবশেষে ২০২৪ সালের জুন মাসে আইনি পন্থায় নিজের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার চট্টগ্রাম কার্যালয়ে একটি লিখিত আবেদন পেশ করে।
আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আদালতের নির্দেশে মা, বাবা এবং সন্তানের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফলাফল আসার পর চিকিৎসালয় কর্তৃপক্ষ সেই গোপন প্রতিবেদনটি সরাসরি আইনগত সহায়তা কার্যালয়ে প্রেরণ করে। বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ওই যুবকটিই উক্ত প্রবাসীর বৈধ সন্তান। এই জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণের পর, গতকাল মঙ্গলবার সরকারি আইনি সহায়তা কার্যালয়ে সকলের উপস্থিতিতে পিতা তাঁর সন্তানকে আইনগতভাবে মেনে নেন এবং একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা সম্পাদন করেন।
সম্পাদিত চুক্তিনামা এবং এই ঘটনার মূল তথ্যের একটি সারসংক্ষেপ নিচের তালিকায় তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | আইনি ও সামাজিক পদক্ষেপের বিবরণ | চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রতিশ্রুত বিষয়সমূহ |
| ১ | আইনি আবেদনের তারিখ ও স্থান | ২০২৪ সালের জুন মাস, সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্র, চট্টগ্রাম |
| ২ | পিতৃত্ব নির্ধারণের পদ্ধতি | ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) পরীক্ষা |
| ৩ | আবাসন সংক্রান্ত সহায়তা | নতুন ঘর বা বাসস্থান তৈরির জন্য নগদ দুই লাখ টাকা প্রদান |
| ৪ | আর্থিক ও আইনি অধিকার | পিতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে বৈধ উত্তরাধিকার প্রদান |
| ৫ | সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা | আত্মীয়স্বজন, সমাজ ও পাড়া-প্রতিবেশীর নিকট সন্তান হিসেবে পরিচয় করানো |
জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা চট্টগ্রাম কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ ও দায়িত্বরত কর্মকর্তা সুব্রত দাশ সংবাদমাধ্যমকে জানান, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাতে পাওয়ার পর পিতা অত্যন্ত সদিচ্ছার সাথে তাঁর সন্তানকে গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ ২৭ বছরের এই পারিবারিক দূরত্বের অবসান ঘটিয়ে উভয় পক্ষ পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধের মীমাংসা করায় সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁদের অভিনন্দন জানানো হয় এবং স্মারক হিসেবে গোলগলা পোশাক উপহার দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম জেলা আইনি সহায়তা কর্মকর্তা এরশাদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, দীর্ঘ সাতাশ বছর পর বাবা ও ছেলের এই আইনি ও সামাজিক পুনর্মিলনের সময় কার্যালয়ের ভেতর এক অভাবনীয় ও অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
জন্মের দীর্ঘ ২৭ বছর পর সমাজের বুকে নিজের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অধিকার পেয়ে ওই যুবক গভীর সন্তোষ ও আনন্দ প্রকাশ করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, এতদিন ধরে কোনো সুনির্দিষ্ট পিতৃপরিচয় না থাকায় সমাজ ও আশেপাশের মানুষের কাছ থেকে তাঁকে প্রতিনিয়ত নানা কটু কথা ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হতো। এখন বিজ্ঞ আদালতের আদেশে এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পিতা তাঁকে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় তাঁর জীবনের সকল গ্লানি মুছে গেছে এবং সমাজে তিনি তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পেয়েছেন।