খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
ভিয়েতনামভিত্তিক টেককম লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর কার্যক্রম গড়ে তুলে বীমা খাতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করছে। যেখানে বিশ্বজুড়ে বীমা খাতে এআই ব্যবহারের অনেক উদ্যোগ পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আটকে রয়েছে, সেখানে প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এআই প্রয়োগ করে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়েছে। শিল্পখাতের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, এআই প্রকল্পগুলোর মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাস্তবে বড় পরিসরে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—যা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
হো চি মিন সিটিতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স ও ইন্স্যুরেন্স এশিয়া সামিটে টেককম লাইফের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা রবীন্দ্র ভেনিসেট্টি বলেন, বীমা খাত এখনও পরীক্ষামূলক প্রয়োগ থেকে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে যেতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার প্রতিযোগিতার ধরন পাল্টে দিচ্ছে। এখানে গতি, দক্ষতা এবং তথ্যভিত্তিক আন্ডাররাইটিং এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
টেককম লাইফ তাদের যাত্রার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানজুড়ে এআই সংযোজন শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো কর্মী সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে না বাড়িয়ে প্রযুক্তি ও এআই-এর মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করা। ভেনিসেট্টি জানান, তারা একটি “এআই-প্রথম” ও “এআই-নেটিভ” প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়, যেখানে অধিকাংশ কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হবে।
ভিয়েতনামে বীমা প্রবেশহার এখনো প্রায় ২ শতাংশের মতো, যা উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত অগ্রগতির (লিপফ্রগ) বড় সুযোগ রয়েছে। পুরোনো অবকাঠামোর জটিলতা না থাকায় নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই ক্লাউড-ভিত্তিক ও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারছে।
বিশ্বখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এআই ব্যবহারের ফলে বীমা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। নিচে সম্ভাব্য প্রভাবগুলো তুলে ধরা হলো—
| ক্ষেত্র | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|
| অপারেশনাল খরচ | সর্বোচ্চ ৪০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব |
| ক্ষতির হার (লস রেশিও) | ৩-৫ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত উন্নতি |
| বিনিয়োগ প্রবণতা | ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে |
| আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি | এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে দ্রুত বৃদ্ধি |
টেককম লাইফ তাদের মূল কার্যক্রম—যেমন মূল্য নির্ধারণ (প্রাইসিং), আন্ডাররাইটিং এবং দাবি নিষ্পত্তিতে এআই প্রয়োগ করছে। ঐতিহ্যগতভাবে এসব কাজ কাগজপত্র বা স্প্রেডশিট নির্ভর ছিল, যা এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও দ্রুত ও নির্ভুল করা সম্ভব হচ্ছে।
গ্রাহকসেবা উন্নত করতে প্রতিষ্ঠানটি “টোরি” নামে একটি নিজস্ব এআই সহকারী চালু করেছে, যা ইতোমধ্যে প্রায় ১,৫০০ এজেন্টের মধ্যে ৮৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। এই সহকারী গ্রাহকের সঙ্গে কথোপকথনের সময় তাৎক্ষণিক পরামর্শ ও তথ্য সরবরাহ করে, ফলে বিক্রয় কার্যক্রম আরও কার্যকর হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রতারণা শনাক্তকরণেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ বীমা দাবিতে প্রতারণার আশঙ্কা থাকে। এআই উন্নত প্যাটার্ন শনাক্তকরণ ক্ষমতার মাধ্যমে এসব ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করতে সহায়তা করছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে টেককম লাইফ চরম স্বয়ংক্রিয়তার দিকেও এগোচ্ছে। ভেনিসেট্টি জানান, তারা মাত্র তিন দিনের মধ্যে কোনো মানব কোডিং ছাড়াই একটি এআই-ভিত্তিক ডকুমেন্ট ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও চালু করতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি এআই এজেন্টরা এখন ভার্চুয়াল কর্মী হিসেবে প্রশাসনিক কাজ ও সফটওয়্যার উন্নয়নে সহায়তা করছে।
তবে এত অগ্রগতির মাঝেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে—কোন উদ্যোগ আগে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নির্ধারণ করা। ভেনিসেট্টি বলেন, “আমাদের কাছে অনেক ধারণা রয়েছে, কিন্তু কোনটি আগে শুরু করবো সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।” অর্থাৎ প্রযুক্তির চেয়ে বাস্তবায়ন পরিকল্পনাই এখন সবচেয়ে বড় বাধা।
সার্বিকভাবে, টেককম লাইফের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে সঠিক কৌশল ও প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বীমা খাতে দ্রুত পরিবর্তন আনা সম্ভব। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এআই-নির্ভর নতুন প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে, যা ভবিষ্যতে পুরো বৈশ্বিক বীমা শিল্পকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।