খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী চন্দ্র নববর্ষ তথা বসন্ত উৎসব। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশটিতে বর্তমানে চলছে বিশ্বের বৃহত্তম বার্ষিক মানব স্থানান্তর, যা স্থানীয়ভাবে ‘চুনইউন’ নামে পরিচিত। কয়েকশ কোটি মানুষের নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়, বরং চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এই উৎসবের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
চলতি বছর চীনের এই বিশেষ ভ্রমণ মৌসুম বা চুনইউন ২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে এবং এটি টানা ৪০ দিন ব্যাপী চলবে। এর মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা আট দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। চীনা কর্মকর্তাদের ধারণা অনুযায়ী, এবারের চুনইউন মৌসুমে মোট যাতায়াতের সংখ্যা ৯৫০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা দেশটির ইতিহাসে একটি নতুন রেকর্ড। গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কয়েকশ কোটি বেশি, যা কোভিড-পরবর্তী সময়ে চীনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
যাতায়াতের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে চীনের পরিবহন ব্যবস্থাকে কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। নিচে এ বছর উৎসবকালীন যাতায়াতের একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
| যাতায়াতের মাধ্যম | প্রত্যাশিত যাত্রী সংখ্যা (৪০ দিনে) | বিশেষ বৈশিষ্ট্য |
| রেলপথ | প্রায় ১০০ কোটি | দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনের ব্যাপক ব্যবহার |
| আকাশপথ | প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১৬.৩ কোটি | আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে বাড়তি ফ্লাইট |
| সড়কপথ | প্রায় ৮০০ কোটির বেশি | ব্যক্তিগত গাড়ি ও আন্তঃজেলা বাস সার্ভিস |
| আন্তর্জাতিক পর্যটন | ৪৫+ দেশের নাগরিকদের ভিসা-মুক্ত সুবিধা | পর্যটন খাতে নতুন গতি সঞ্চার |
চীন সরকার বর্তমানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি এবং উচ্চ সঞ্চয়ের প্রবণতা কমিয়ে খরচ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বসন্ত উৎসবকে কেন্দ্র করে খুচরা বিক্রয়, পর্যটন এবং বিনোদন খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রবাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে বেইজিং সরকার ইতোমধ্যে ৩ কোটি ৬০ লাখ ইউয়ান (প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার) সমমূল্যের ভোক্তা ভাউচার বিতরণ করার ঘোষণা দিয়েছে। এই ভাউচারগুলো সাধারণ মানুষকে রেস্তোরাঁ, কেনাকাটা এবং ভ্রমণে অধিক অর্থ ব্যয়ে উৎসাহিত করবে।
উৎসবের ছুটিতে চীনের সিনেমা হলগুলোতেও বইছে আনন্দের হাওয়া। গত বছর ‘নে ঝাহ ২’-এর ব্যাপক সাফল্যের পর এ বছর ‘পেগাসাস ৩’ এবং ‘স্কেয়ার আউট’-এর মতো বড় বাজেটের ছবিগুলো মুক্তি পেয়েছে, যা কোটি কোটি দর্শক টানতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যটনকে উৎসাহিত করতে চীন সরকার ৪৫টিরও বেশি দেশের জন্য ভিসা-মুক্ত প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলো থেকে পর্যটকদের আগমন বাড়ছে, যা চীনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পর্যটন রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
খাদ্য, বিনোদন এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতগুলোকে চীনের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বসন্ত উৎসবের এই ৪০ দিনে দেশজুড়ে যে পরিমাণ বাণিজ্যিক লেনদেন হয়, তা সমগ্র বছরের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। সামগ্রিকভাবে, চীনের এই বসন্ত উৎসব কেবল পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার উপলক্ষ নয়, বরং এটি দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার এক বিশ্বস্ত প্রতিচ্ছবি।