খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ফিফা প্রবর্তিত নতুন ‘শান্তি পুরস্কার’ বা ‘পিস প্রাইজ’ নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই পুরস্কার প্রদানের তীব্র সমালোচনা করে তা বাতিলের আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়েছে নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (এনএফএফ)। নরওয়ের দাবি, ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে এই পুরস্কার সরাসরি সাংঘর্ষিক।
গত ডিসেম্বরে ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠান চলাকালীন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো প্রথমবারের মতো এই শান্তি পুরস্কার ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন। এই সিদ্ধান্তের পরপরই বিশ্বজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পকে ‘শান্তি পুরস্কার’ প্রদানকে বিদ্রূপের চোখে দেখছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিসে ক্লাভেনেস সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ফিফার কাজ ফুটবল পরিচালনা করা, রাজনৈতিক পুরস্কার দেওয়া নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শান্তি পুরস্কারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো তদারকি করার জন্য ‘নোবেল ইনস্টিটিউট’-এর মতো স্বাধীন ও অভিজ্ঞ সংস্থা রয়েছে। ফিফার পক্ষ থেকে এমন কোনো পুরস্কার দেওয়ার আইনি বা প্রশাসনিক এখতিয়ার নেই বলে তিনি মনে করেন।
লিসে ক্লাভেনেসের মতে, ফিফার নিজস্ব রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতিমালা এই পুরস্কারের মাধ্যমে লঙ্ঘিত হয়েছে। তাঁর আপত্তির প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
স্বচ্ছতার অভাব: এই পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে ফিফার অভ্যন্তরীণ কোনো বিধিবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়া বা মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি।
নিরপেক্ষতার সংকট: রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে ফিফার যে দূরত্ব বজায় রাখা উচিত, এই পুরস্কার সেই ভারসাম্য নষ্ট করেছে।
দক্ষ বিচারক প্যানেলের অনুপস্থিতি: শান্তি পুরস্কার প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, নিরপেক্ষ বিচারক প্যানেল এবং গভীর গবেষণার প্রয়োজন হয়, যা ফিফার নেই।
রাজনৈতিক রং: পর্যাপ্ত স্বাধীন কাঠামো ছাড়া এ ধরনের উদ্যোগ অনিবার্যভাবে রাজনৈতিক রূপ নেয়, যা ফুটবলের জন্য ক্ষতিকর।
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| পুরস্কারের নাম | ফিফা পিস প্রাইজ (শান্তি পুরস্কার) |
| প্রথম প্রাপক | ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাষ্ট্র |
| পুরস্কার প্রদানের সময় | ডিসেম্বর ২০২৫ (২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানের সময়) |
| আহ্বানকারী সংস্থা | নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (এনএফএফ) |
| প্রধান দাবি | পুরস্কার বাতিল এবং ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ বন্ধ করা |
| সহযোগী সংস্থা | ‘ফেয়ারস্কয়ার’ (মানবাধিকার ও প্রচারগোষ্ঠী) |
| অভিযোগের ভিত্তি | রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া |
মানবাধিকার ও প্রচারগোষ্ঠী ‘ফেয়ারস্কয়ার’ ইতিমধ্যে ফিফার নৈতিকতা কমিটির কাছে এই পুরস্কার নিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে। এনএফএফ এই অভিযোগকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ক্লাভেনেসের দাবি, ফিফার নৈতিকতা কমিটিকে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে এই অভিযোগ মূল্যায়ন করতে হবে এবং এর চূড়ান্ত ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ভঙ্গের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিচার করা উচিত।
পুরস্কার বিতর্কের পাশাপাশি ২০২৬ বিশ্বকাপে দর্শকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন নরওয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই)-এর কর্মকর্তারা বিশ্বকাপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিযুক্ত থাকবেন। এনএফএফ-এর আশঙ্কা, এই কর্মকর্তারা অভিবাসী দর্শকদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারেন, যা স্টেডিয়ামের নিরাপদ পরিবেশকে বিঘ্নিত করতে পারে।
ক্লাভেনেস জানিয়েছেন, আগামী ৩০ এপ্রিল ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠেয় ফিফা কংগ্রেসে তিনি বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করবেন। তাঁর লক্ষ্য হলো, ফিফা যেন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে নিশ্চিত করে যে আইসিই কর্মকর্তারা সাধারণ দর্শকদের হয়রানি করবেন না। তিনি বলেন, “বিশ্বকাপ হওয়া উচিত সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ। আমরা জানতে চাই ফিফা কীভাবে স্টেডিয়ামগুলোতে আইসিইর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করবে।”
নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন শীঘ্রই ফিফাকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাবে যেখানে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাহীন সকল প্রকার পুরস্কার প্রদান বন্ধের দাবি জানানো হবে। তারা মনে করে, ফিফাকে তার মূল ম্যান্ডেট অর্থাৎ ফুটবলের উন্নয়নে মনোনিবেশ করা উচিত এবং রাজনৈতিক বিতর্কে জড়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত। এখন পর্যন্ত অন্যান্য দেশের ফুটবল ফেডারেশনগুলো এ বিষয়ে নীরব থাকলেও, নরওয়ের এই সাহসী অবস্থান আন্তর্জাতিক ফুটবল রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।