খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
মরক্কোর জাতীয় ফুটবল দলের তারকা রক্ষণভাগের খেলোয়াড় বা ডিফেন্ডার নুসাইর মাজরাউই আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্বকাপের পর পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ার থেকে অবসরের পরিকল্পনা করছেন। বর্তমানে ২৮ বছর বয়সী এই বিশ্বখ্যাত ফুটবলার জানিয়েছেন যে, ফুটবলের বর্ণিল ক্যারিয়ারে ইতি টানার পর তিনি তার জীবনের সম্পূর্ণ মনোযোগ পবিত্র কোরআন মুখস্থ করা এবং ধর্মীয় সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার দিকে দিতে চান। তার এই ব্যতিক্রমী ও আধ্যাত্মিক ভাবনার কথা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে বিগত মার্চ মাসে দেওয়া একটি পুরোনো বিশেষ সাক্ষাৎকারে নুসাইর মাজরাউই প্রথমবার তার এই ভাবনার কথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপই হতে পারে তার আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ আসর। নিজের ভবিষ্যৎ জীবন পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে গিয়ে মাজরাউই বলেছিলেন, ‘আমি হয়তো চলমান বা আসন্ন বিশ্বকাপের পরই ফুটবল থেকে চূড়ান্তভাবে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি। কারণ মানুষের জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। আমি অবসরের পর পবিত্র কোরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করতে চাই এবং ভবিষ্যতে কোনো একদিন একটি মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাই।’
তার এই পুরোনো বক্তব্যটি চলতি বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুন করে ফুটবল ভক্ত ও ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও তিনি এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন বা বিবৃতির মাধ্যমে তার মাঠ থেকে বিদায়ের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ চূড়ান্ত করেননি, তবুও এটা নিশ্চিত যে তিনি ধর্মীয় জীবন ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি নিজের আগ্রহ থেকেই এমন একটি বড় সিদ্ধান্তের কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন।
ইসলামি স্কলার এবং ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, পবিত্র কোরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করা বা ‘হিফজ’ সম্পন্ন করা অত্যন্ত নিবিড়, দীর্ঘমেয়াদি এবং কঠিন একটি প্রক্রিয়া। এই আধ্যাত্মিক লক্ষ্যটি সফলভাবে অর্জন করতে হলে একজন মানুষের বহু বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, গভীর মনোযোগ এবং কঠোর অধ্যবসায়ের প্রয়োজন হয়। এর পাশাপাশি কোনো একটি মসজিদের খতিব বা ইমাম হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা কেবল কোরআন মুখস্থ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন ইমামকে অবশ্যই ইসলামি শরিয়াহ, ফিকহ বা গভীর ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি একটি বৃহৎ মুসলিম কমিউনিটিকে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও বিশেষ দক্ষতার অধিকারী হতে হয়। মাজরাউই তার ফুটবল পরবর্তী জীবনে এই দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়াটির মধ্য দিয়েই নিজেকে পরিচালনা করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন।
পেশাদার ফুটবল খেলার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও নুসাইর মাজরাউই যে ইসলামি মূল্যবোধ ও শরিয়াহভিত্তিক জীবনযাপনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তার বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ও আর্থিক সম্পৃক্ততায়। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বিশ্ববিখ্যাত এবং সম্পূর্ণ ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত আন্তর্জাতিক ফিনটেক বা আর্থিক প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াহেদ’-এর সাথে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন।
বিগত মার্চ মাসেই তিনি এই স্বনামধন্য ইসলামি ফিনটেক প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার এবং বড় শেয়ারহোল্ডার হিসেবে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আর্থিক খাতের এই সম্পৃক্ততা তার ব্যক্তিগত ধর্মীয় চেতনা, নৈতিক মূল্যবোধ ও ভবিষ্যতের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন অর্থনীতি ও ক্রীড়াঙ্গনের বিশ্লেষকেরা।
বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো একটি বিশ্বমঞ্চে মরক্কোর হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স প্রদর্শনকারী এই তারকার এমন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখন কেবল আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিভিন্ন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিসরেও গভীর আগ্রহ ও প্রশংসার জন্ম দিয়েছে। একজন পেশাদার ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ারের সোনালী সময়ে এসে এমন একটি আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে বেশ বিরল ঘটনা। ফুটবল ভক্তরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন যে, ২০২৬ সালের এই মেগা টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর মরক্কোর এই ডিফেন্ডার মাঠের সবুজ গালিচা ছেড়ে সত্যিই পবিত্র কোরআনের হাফেজ ও মসজিদের ইমাম হওয়ার পথে তার নতুন জীবনযাত্রা শুরু করেন কি না।