এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
আজ বাংলাদেশের কিংবদন্তি ব্যাংকার, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, সোনালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থান প্রকল্প (বিকল্প)-এর প্রতিষ্ঠাতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক, আদমজী পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, জাতীয় কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন সহ-সভাপতি, বৃহত্তর বগুড়া সমিতির সাবেক সভাপতি এবং একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক লুৎফর রহমান সরকারের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী।
১৯৩৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আমরুল ইউনিয়নের ফুলকোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সৃজনশীল, সাহসী, গণমুখী ও মানবিক চিন্তার মানুষ হিসেবে। আমার দেখা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রগতিশীল, সৎ, উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন এবং জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ ব্যাংকার ছিলেন লুৎফর রহমান সরকার।
তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্যাংকিং শুধু মুনাফার জন্য নয়; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তাঁর ভাষায়—
“বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেকটা তেলে মাথায় তেল দেওয়ার মতো। যার আছে, তাকে আরও দেওয়া হয়। অথচ ব্যাংকিং হওয়া উচিত যার নেই, তাকে দেওয়ার জন্য। ব্যাংকের কাজ ধনীকে আরও ধনী করা নয়, গরিবকে স্বাবলম্বী করে তোলা।”
তিনি শুধু এ কথা বলেই ক্ষান্ত হননি; বাস্তবেও তার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে বেকারত্ব দূরীকরণ এবং শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থান প্রকল্প (বিকল্প)”। উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণদের কেবল এমএ ডিগ্রির সনদকে ভিত্তি করে ঋণ দিয়ে তিনি অসংখ্য উদ্যোক্তা সৃষ্টি করেছিলেন। একই সঙ্গে চালু করেছিলেন শিক্ষা ঋণ ও খণ্ডকালীন চাকরি প্রকল্প, যা সে সময় দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে প্রচলিত বহু সঞ্চয়ী ও জনকল্যাণমূলক স্কিমের ধারণা ও ভিত্তি তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তা থেকে উৎসারিত। তিনিই দেশে প্রথম ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম চালু করেন, যা আজ এসএমই ঋণ হিসেবে পরিচিত। গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে তিনি শিক্ষা ঋণ কর্মসূচি চালু করেন। চিকিৎসা খাতের আধুনিকায়নে ডাক্তারদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। দেশের অনেক খ্যাতিমান চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান তাঁর সহযোগিতার ফলেই বিকশিত হয়েছে।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা শিল্পের প্রতিও ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগঠন এবং সৃজনশীল প্রকাশনাকে তিনি অকাতরে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। স্বল্পসুদে ও সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে তিনি প্রকাশনা শিল্পকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
লুৎফর রহমান সরকার ছিলেন আপসহীন নীতিবান মানুষ। স্বৈরশাসক এরশাদ জনপ্রিয় “বিকল্প” প্রকল্পটি নিজের নামে চালু করার প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলেই তাঁকে এবং তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকে গ্রেফতার করে সামরিক আদালতে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তাঁরা মুক্তি লাভ করেন।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংকার, যিনি প্রকাশ্যে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। আবার তিনিই দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যাংক জালিয়াতির বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে মামলা দায়ের করেছিলেন। ক্ষমতা ও প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে তিনি ন্যায় ও জনস্বার্থের পক্ষে অবিচল ছিলেন।
লুৎফর রহমান সরকার ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবন শুরু করেন রেডিও পাকিস্তানে। পরে হাবিব ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ১৯৯৮ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ষষ্ঠ গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন।
২০১৩ সালের ২৪ জুন ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে গণমুখী, মানবিক ও উন্নয়নমুখী রূপ দেওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি শুধু একজন সফল ব্যাংকার ছিলেন না; ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, সমাজসংস্কারক এবং মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির অক্লান্ত সংগ্রামী।
বাংলাদেশে যদি কাউকে প্রকৃত অর্থে “বিপ্লবী ব্যাংকার” বলা যায়, তবে তিনি নিঃসন্দেহে লুৎফর রহমান সরকার।
তাঁর ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, বিনম্র কৃতজ্ঞতা এবং অফুরন্ত ভালোবাসা।
শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই ক্ষণজন্মা মহৎ মানুষটিকে।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক – জি লাইভ ২৪ ও খবরওয়ালা।