খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 28শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ১২ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশে ডিজেল আমদানি দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানিব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় প্রায় সম্পূর্ণ আমদানি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে হত, বিশেষ করে কুয়েতের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬–০৭ অর্থবছরে বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) যে ডিজেল আমদানি করেছিল, তার ৯১ শতাংশ এসেছিল কুয়েত থেকে, এবং ভারতের অংশ ছিল মাত্র ৯ শতাংশ।
গত দুই দশকে ডিজেল আমদানির চিত্র উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ক্রমে প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারত ডিজেল সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চলতি অর্থবছরের (জুলাই–ফেব্রুয়ারি) প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ মোট প্রায় ২৩ লাখ টন ডিজেল আমদানি করেছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে ৪১ শতাংশ এবং মালয়েশিয়া থেকে ২৪ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অংশ কমে বর্তমানে প্রায় ২০ শতাংশেরও কম।
| বছর | কুয়েত | ভারত | সিঙ্গাপুর | মালয়েশিয়া | অন্যান্য দেশ |
|---|---|---|---|---|---|
| ২০০৬–০৭ | ৯১% | ৯% | ০% | ০% | ০% |
| ২০১৫–১৬ | ৩০% | ১০% | ৪০% | ১৫% | ৫% |
| ২০২৩–২৪ | ১২% | ১৫% | ৪০% | ২৪% | ৯% |
| ২০২৫–২৬ (জুলাই–ফেব্রুয়ারি) | ১০% | ১৪% | ৪১% | ২৪% | ১১% |
ভারত এখনও বাংলাদেশে ডিজেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেডসহ কয়েকটি কোম্পানি নিয়মিত ডিজেল সরবরাহ করে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ভারত থেকে ডিজেল সরাসরি আনা হচ্ছে বাংলাদেশ–ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে। প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত ডিজেল পৌঁছে দেয়। পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঠানো তেল দুই দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে পৌঁছে যায়। চুক্তি অনুযায়ী বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল পাইপলাইনের মাধ্যমে আমদানি করা সম্ভব।
গত পাঁচ বছরে ভারতের অংশ সর্বাধিক ছিল ২০২৩–২৪ অর্থবছরে, যখন প্রায় ৫ লাখ ৫১ হাজার টন ডিজেল এসেছে, যা মোট আমদানির ১৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ভারত থেকে এসেছে প্রায় ৩ লাখ ৩৩ হাজার টন।
ডিজেল আমদানি এখন সরকারের প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এবং জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানান, “আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় হওয়ায় সরবরাহ–ঝুঁকি কমেছে। কোনো একটি অঞ্চলে সমস্যা হলেও বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।”
বর্তমানে দেশে ডিজেলের চাহিদা সর্বমোট জ্বালানির প্রায় ৬৩ শতাংশ। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর বড় অংশ সরাসরি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়, এবং দেশি তেল পরিশোধন করে বছরে ৭–৭.৫ লাখ টন ডিজেল পাওয়া যায়।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা ব্রুনেই থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করছি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আমদানি করা সম্ভব, যা আমদানির উৎসকে আরও বৈচিত্র্যময় করবে।”
বাংলাদেশের ডিজেল আমদানির এই বহুমুখী নীতি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে এবং একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। বর্তমানে সড়ক, নদীপথ, কৃষি ও শিল্পখাতে ডিজেলের চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে, এবং এই বহুমুখী সরবরাহ নীতি তা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।