বেনজির শিকদার
প্রকাশ: রবিবার, ৩০ মার্চ ২০২৫
১.
খেয়াঘাটে কেউ নেই
শালিকের পায়ে ভর দিয়ে আছে, মানুষের মতো রেখা
শীত ছুঁই ছুঁই অন্ধ বিকেলে— যায় না কিছুই দেখা।
মলিন মাছির ভনভনে শুনি প্রাচীন দিনের গান;
খেয়াঘাটে আজ কেউ নেই যেন— ধুঁকছে জলের প্রাণ!
শ্বাসরোধে যারা হারিয়েছে আশ— তাদের কথাই ভাবি
চিতার দহনে চারুশোকে আছে— অন্ধদিনের চাবি!
পিতার জখমে মাতৃযাতনা যাপন অঘোর ঘুমে;
আঁধার এখানে বসে আছে ঠায় আলোহীন মৌসুমে!
দূরের আকাশে ছোট ছোট তারা মিটিমিটি কিছু আলো
আহত আত্মা বিলাপবিধুর— জন্মজখমে কালো!
গুহা থেকে গৃহ বারোয়ারি সব ভুলেছে আপন-পর;
খেয়াঘাটে আজ কেউ নেই যেন— মায়াহীন অণুস্বর।
চেতনার ঘুণে জীবিকার নুনে মানুষের যত ভ্রম
দিক ভুলে যায় ছায়ার তরণি— গ্রাস করে অনুপম!
বেসাতির ভিড়ে মিছে অনাচারে লোভের ঘোড়াটি ছোটে;
ছোট ছোট ক্ষত বেড়ে অবিরত— ঘাই মারে হৃদপুটে!
হাতের বাঁধন আলগা হয়েছে, মনের জমিনে চর
চরের জমিতে চাষবাস নেই, ফুল-ফলহীন ঘর;
সুবাস এখানে বৃত্তবন্দী মলিন এখানে মুখ
দিনে দিনে তাই কৃত্রিম হয় যাপনতরির সুখ।
মৃত্যুও যেন আড়িপাতে রোজ জীবনের জয়গানে
হট্টগোলের হাভাতেরা হাসে কতিপয় কিছু দানে;
আধুনিক বলে ভুলে গেছি সব সাবেকি হিসাবপ্রথা
নিঠুর নিনাদে কিলবিল করে আঁধারের অমরতা।
বিবিধ ব্যাধির বঙ্কিমরেখা সময়ের কাঁধে বসে
বেসুরো বাজছে ইচ্ছের বাঁশি নিয়তি দম্ভদোষে;
দোদুল্যমান নৌকার বুকে ব্যথাতুর কত কথা
বুকের দেরাজে আলগোছে পোষা অনুপম নীরবতা।
কু-চেতনা যত লালসার ক্ষত আঁধার চাষের ক্ষণ
মিথ্যা মদিরা পান করে হাসে— মানুষের আয়োজন!
ক্ষমতা-প্রণয়ে হাহাকার বাড়ে বিষাদের ঘন ঘ্রাণ;
মানুষ কোথায়? দেয় না তো কেউ গুণের দড়িতে টান!
জাবেদা খাতায় দূরগামী দোলা দৃশ্যত কিছু নাই
উল্টো কাছিম হাতড়ে বেড়ায় মাথা গুঁজবার ঠাঁই;
মাধুকরী বেশ কবে হবে শেষ বিবর্তনের ধারা
মুখোমুখি তবু সংলাপহীন আদালত দিশেহারা।
মিছিলের মতো প্রহসন বাড়ে নির্ঘুম শত রাত
অগ্নিগর্ভা মহাকাল লেখে খড়গের ধারাপাত;
প্রগতিশীলের অনুবাদজুড়ে মূর্খের মনোগ্রাম
খেয়াঘাটে আজ কেউ নেই যেন শ্মশান সর্বনাম।
জলের জোয়ারে ভাসিয়ে দিলাম— ভাবনার দোলাচল;
খেয়াঘাটে আজ কেউ নেই তাই, পারাপার হলো ছল!
২.
ন্যুব্জ নিবেদন
তুমি দেখে নিয়ো—
দুর্যোগের রাত্রি শেষে
আমরা শিখে নেব ঘন বৃক্ষের প্রেম!
আমাদের ঘর হবে নিখিল সবুজে ঢাকা
একরত্তি উন্মাতালের প্রেমালু বাগান!
দগ্ধ সময়ের ক্ষতচিহ্ন মুছে—
মুখোমুখি বসব কূজনে দুজন
বালিহাঁসের নরম ঠোঁটের মতো
ভালোবাসা মুছে দেবে মৃত্যুর স্বাদ!
তুমি দেখে নিয়ো—
শ্রীহীন এ শহর হবে ঋতুবতী
অতসীর মতো খসে পড়া আস্তর সাদৃশ্য নয়
মুগ্ধতার মহিমাদীপ্ত যবনিকায় ফিরবে
ঘুণে ধরা অভিশপ্ত দেহের বলি-রুক্ষ ত্বক!
বন্ধ দুয়ারের আলোহীন অন্ধ-সজ্জায়
বড় মৌনতায় লুটোপুটি খাবে ছেনাল রোদ্দুর,
নিকোনো যৌবন ঘিরে নেশাতুর কামরাঙা সুঘ্রাণ;
আঁখিপাতে শঙ্খচিল পারাপারের হলুদ স্বপ্নালু সাম্পান!
তুমি দেখে নিয়ো—
দহন-বায়ু কিংবা অম্লজানে
ছেয়ে যাবে এ শহর— বিটপীর উলঙ্গ ডাল
মুগ্ধ চাষির আঙিনায় ফুটবে প্রেমার্দ্র বসন্তের চেরি;
নটী-জলসার মৃত্যুঠোঁট ছিঁড়ে; সাজবে ভ্রূণের বাসর!
ধুতরা, হেমলক কিংবা আকন্দ-হিজল ভুলে
সর্বগ্রাসী হাহাকার ফিরবে অবিরল ধারাপাতে
বাতাসের চিবুক ছুঁয়ে প্রজ্বলিত ধবল জোছনায়;
অমল প্রেম হব মেঘের সিঁথিতে— আকাশের গায় !
তুমি দেখে নিয়ো—
আলোহীন-ধূসর-মন্দাক্রান্ত সময়ের ভারে—
জলধ মেঘের মতো; যদি ন্যুব্জ হয়ে আসে পৃথিবী;
নিশ্বাসের হাপরে রেখে সুবর্ণকারের কৌশলী চোখ;
পোড়াব সভ্যতা; পবিত্রতার— পরিশুদ্ধ প্রার্থনায়।
৩.
সময়াবর্তন
এখানে জমেছে ঘরহারা মেঘ ওখানে জমেছে ধুলো
নিজের আয়না, নিজেই তাকালে ধরা পড়ে ভুলগুলো।
মুখোশ এখানে দরকারি খুব, মুখ সেই ছায়াপথ
এখানে মানুষ থাকে না এখন, আঁধারের দাসখত।
এখানে জমেছে বেদনার জল ওখানে দুখের সুর
কেঁদেকেটে মরি সুখের আঙিনা এখনো বহুটা দূর!
পরাজিত লোক পরাজিত মন পরাজিত আজ সব
জয়ের পীড়নে কেঁদে যায় রোজ পরাজিত অনুভব।
পরাজিত নই আমি—
আমার কাছে তো প্রণয় সত্য জীবন এখনো দামি।
সময়ের চাপে এই জীবনও ক্ষয়ে যাবে ঘোরপথে
সরে যাব ঠিক মরে যাব জানি তুমুল বেদনা-ক্ষতে।
জীবনের মানে বেঁচে থাকা নয় জীবনের মানে প্রীতি
সেই প্রীতিতেই চলে যেতে হয় মিছে এ উপস্থিতি!
কেউ তো থাকেনি সবাই উধাও ছিল যারা এই ভবে
প্রয়াত ফুলের খবর জগতে রেখেছে কে আর কবে?
এই ভূমিজুড়ে ছিল যারা কাল আজ তারা ঠিক গত
চারপাশে দেখো ছড়ানো-ছিটানো স্মৃতিফুল কত শত।
যেখানে তোমার বসত এখন সেখানে একদা কেউ
পেতেছিল তার সংসারজাল গুনেছে সময়-ঢেউ।
নগ্ন হাসিতে মগ্ন হয়েই চিত্ত দুলিয়ে বাঁচা;
যাপনের দিন গত হলে পর পাখি ছেড়ে যায় খাঁচা।
নেই তারা কেউ তুমি আছ আজ, তুমিও তো যাবে চলে
অনন্তকাল কেঁদেছে মানুষ এমনি বিদায়জলে।
কেঁদে নেই কোনো ফল—
বিদায়টুকুই শাশ্বত আজ, বাকি সবকিছু ছল।
এমনি থাকবে সাগর-ফোয়ারা উতল নদীর পানি
বাহির দখলে ভেতরে জমবে বারোয়ারি রাজধানী।
মানুষেরা যাবে মহাকাশ ফুঁড়ে অন্যদূরের গ্রহে
সামান্য এই পৃথিবীযাপন অনন্তবাস নহে!
ছেড়ে যেতে হবে এটুকু জেনেও চুপচাপ থাকি বসে
চোখের নিকটে কত লোক মরে কত যুগ যায় ধসে।
সময় হিরণ্ময়—
হারায়, আবার হারিয়েও যায়, থমকে থাকার নয়!
ভেসে যায় কত রাজার প্রাসাদ কীর্তিমানের কাজ
আসলে সবই মিথ্যা মোড়কে সময়-ফুঁয়ের সাজ।
অর্থহীন এ যাপনবিলাস অর্থহীন এ বাস;
সময় নিজেও সময়ের কাছে হয়েছে কোথাও দাস।
ফাঁকির খাতায় নাম লিখিয়েছি জাদুকরি এই মন
মায়ার মোহেতে আটকে ভেবেছি জনে জনে প্রিয়জন!
আসলে মানুষ একা—
হাজার বছর কেটে যায় তবু পায় না নিজের দেখা!