খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ৬:০ পিএম
দারিদ্র্যের চাপে জীবনের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানোই যেখানে কঠিন, সেখানে মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ ঠাঁই পাওয়াও যেন বিলাসিতা হয়ে উঠেছে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের রেহানা খাতুনের জন্য। দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের মাথার চুল বিক্রি করে ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে হয়েছে তাকে। এখন ঘরহীন অবস্থায় খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশের খোলা জায়গায় সন্তানদের নিয়ে দিন কাটছে তার।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় রেহানা দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ভাড়া করা ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় সেই সামান্য আশ্রয়টুকুও হারাতে হয় তাকে। ঘর ছাড়ার পর সন্তানদের নিয়ে আশ্রয় নেন রেললাইনের পাশে সরকারি জমিতে। সেখানে বর্তমানে একটি ঘরের কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। তবে অর্থের অভাবে সেই কাঠামোও এখনো পূর্ণাঙ্গ ঘরে রূপ নেয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় রেলব্রিজের পাশে বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। কয়েক মাস ধরে সেটি সেভাবেই পড়ে আছে। ঘরের জন্য প্রয়োজনীয় টিন, বেড়া কিংবা অন্যান্য উপকরণ কেনার সামর্থ্য রেহানার নেই। ফলে প্রখর রোদ, বৃষ্টি কিংবা রাতের প্রতিকূল আবহাওয়া—সবকিছুর মধ্যেই দুই সন্তানকে নিয়ে তাকে বসবাস করতে হচ্ছে।
রেহানার অসহায়ত্বের একটি ঘটনা স্থানীয়দের বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। বাসিন্দা ফেরদৌসী বেগম জানান, একসময় রেহানা পাশের একটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকতেন। পরে একদিন তার মাথায় চুল না দেখে বিষয়টি জানতে চান তিনি। তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে রেহানা জানান, ৫০০ টাকা ঘরভাড়া পরিশোধ করার জন্য নিজের চুল বিক্রি করতে হয়েছে তাকে।
এই ঘটনা শুধু রেহানার ব্যক্তিগত দুর্দশার চিত্র নয়; বরং চরম অর্থকষ্টে থাকা একটি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই কতটা কঠিন হতে পারে, তারও একটি নির্মম উদাহরণ। দুই সন্তানকে নিয়ে কোনো রকমে দিন পার করছেন তিনি। আয়-রোজগারের স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাও তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিম শেখ বলেন, রেহানার পরিস্থিতি অত্যন্ত করুণ। দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তার জন্য দ্রুত একটি ঘরের ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
আরেক বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, স্থানীয়ভাবে রেহানার জন্য বাঁশের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এখন টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করা গেলে অন্তত একটি সাধারণ ঘর নির্মাণ সম্ভব হবে। এলাকার সামর্থ্যবান মানুষ ও মানবিক ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে রেহানা ও তার সন্তানদের মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ জায়গা তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
সরেজমিনে সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে রেললাইনের পাশে একটি অসম্পূর্ণ বাঁশের কাঠামো দেখা যায়। সেটিই এখন রেহানার ভবিষ্যৎ ঘর। কাঠামোর চারপাশে নেই প্রয়োজনীয় বেড়া, মাথার ওপর নেই টিনের ছাউনি। তবু ওই কাঠামোকেই ঘর হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। কারণ সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে থাকার মতো আর কোনো জায়গা তার হাতে নেই।
রেহানা খাতুন বলেন, দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি সব কষ্ট সহ্য করছেন। থাকার মতো ঘর নেই, খাবারেরও সংকট রয়েছে। চরম নিরুপায় হয়েই চুল বিক্রি করে ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে হয়েছে। এখন তার একমাত্র প্রত্যাশা—সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে থাকার মতো একটি ঘর।
স্থানীয়দের দাবি, রেহানার পরিবারের মতো অসহায় ও গৃহহীন মানুষের জন্য সরকারি আবাসন সহায়তার ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি এবং মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করে অন্তত একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করা সম্ভব।
রেহানার গল্পে দারিদ্র্যের যে কঠিন বাস্তবতা ফুটে উঠেছে, তা সহানুভূতির পাশাপাশি কার্যকর সহায়তারও দাবি রাখে। দুই শিশুকে নিয়ে তার পরিবার যেন আর রেললাইনের পাশে অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকে—এমন একটি নিরাপদ আশ্রয়ই এখন তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
মন্তব্য