খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
এবিএম জাকিরুল হক টিটন
একেবারে তুচ্ছ অভিযোগে, কখনো প্রশ্ন তোলার অপরাধেল, কখনো মত প্রকাশের কারণে, শুধু কোনো বিশেষ রাজনৈতিক আর্দশ ধারনের জন্য-হাজার হাজার মানুষ আজ বাংলাদেশের কারাগারে বন্দি। এই মানুষগুলোর কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই, নেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে তাদের নিয়ে নেই কোনো উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ, নেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগ, নেই তথাকথিত মানবাধিকার রক্ষকদের বিবৃতি। যেন এই নাগরিকদের কোনো অস্তিত্বই রাষ্ট্র কখনো স্বীকার করেনি।
প্রশ্ন করাই কি অপরাধ?
আবু আলম শহীদ খান (সাবেক সচিব) কোনো সহিংসতায় জড়াননি, কোনো রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রেও নয়—তিনি করেছিলেন মাত্র একটি প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে রাষ্ট্র তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছে। মাসের পর মাস তাঁকে আটকে রাখা হয়েছে জামিনহীন অবস্থায়। অভিযোগ রয়েছে, বিচারকদের ওপর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য চাপ, হুমকি এবং সামাজিক ‘মব জাস্টিস’-এর ভয় তৈরি করা হয়েছে, যাতে তারা জামিন শুনানি করতেও সাহস না পান।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি ভয়ংকর দৃষ্টান্ত—যেখানে বিচার বিভাগ কার্যত ভয়ের সংস্কৃতির শিকার।
জনপ্রিয়তা অপরাধ হয়ে গেলে
ব্যারিস্টার সুমনের ঘটনা আরও ভয়াবহ ইঙ্গিত দেয়। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত এমপি নন, বরং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত। সারাদেশে তাঁর জনপ্রিয়তা ও আইনি সচেতনতা তৈরির ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। অথচ তুচ্ছ অভিযোগে তাঁকে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—অপরাধ কি আসলেই আইনি, নাকি রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠাই তাঁর মূল ‘দোষ’?
অবস্থান বদলালেই কারাগার?
আনিস আলমগীর ছিলেন একসময় ‘জুলাই, আন্দোলন ‘ এর সমর্থক বলে পরিচিত। কিন্তু নিজের বিবেক, উপলব্ধি ও ন্যায়বোধ থেকে যখন তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ শুরু করলেন, তখনই তাঁকে কারাগারে পাঠানো হলো। অভিযোগের ভিত্তি কী? একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট—যেখানে তিনি একটি প্রতীকী ছবি শেয়ার করেছিলেন। রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও ভয় ধরানো।
এটি স্পষ্ট করে দেয়—সমস্যা অপরাধে নয়, সমস্যাটি ভিন্নমত ও অবস্থান বদলের সাহসে।
বিচারালয়: শেষ আশ্রয় থেকেও বঞ্চিত নাগরিক
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের শেষ আশ্রয় বিচারালয়। কিন্তু আজ সেই আশ্রয়ও ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘসূত্রতা, জামিন অস্বীকৃতি, বিচার শুরুর আগেই শাস্তির মতো দীর্ঘ কারাবাস—সব মিলিয়ে নাগরিকের মৌলিক আইনি অধিকার কার্যত ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সংবিধান যেখানে বলে-
ব্যক্তি স্বাধীনতা সুরক্ষিত
বিচারবহির্ভূত আটক অবৈধ
জামিন নীতি ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়ম
সেখানে বাস্তবতা ঠিক উল্টো।
নীরব মানবাধিকার, নীরব বিশ্ব
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নেই কোনো উচ্চকণ্ঠ আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ। নেই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতি, নেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার জরুরি উদ্বেগ। ফলে রাষ্ট্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে, আর কারাগার ভরে উঠছে নিরপরাধ মানুষে।
ভোটের আগে গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত
নির্বাচনের আগে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব হলো—
সব রাজনৈতিক ও মতপ্রকাশজনিত মামলায় আটক নিরপরাধ নাগরিকদের মুক্তি
জামিনযোগ্য মামলায় অবিলম্বে জামিন
বিচারকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
ভিন্নমতকে অপরাধ না বানানো
এটি কোনো দলীয় দাবি নয়; এটি গণতন্ত্রের স্বার্থে নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।
স্পষ্ট আহ্বান
ভোটের পূর্বে, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে—
সকল নিরপরাধ, মতপ্রকাশের কারণে আটক, সকল পেশার মানুষকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
কারাগারে বন্দি মানুষ নয়, ভয়মুক্ত নাগরিকই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত।
নচেৎ ইতিহাস আবারও সাক্ষ্য দেবে—
কারাগারে যখন সত্য বন্দি হয়, তখন রাষ্ট্র নিজেই তার নৈতিক বৈধতা হারায়।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা।