খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রংপুরের পীরগাছা–কাউনিয়া এলাকায় আলু চাষ করে কৃষকেরা বড় লোকসানের মুখোমুখি হয়েছেন। মাসুম মিয়া গত বছর ১০ একর জমিতে আলু চাষ করে ১৮ লাখ টাকা লোকসান গুনেছেন। পরিবারে চাপ কমাতে ইতিমধ্যেই তিনটি গরু বিক্রি করেছেন। ভয়ে এ বছর তিনি আলু চাষ কমিয়ে করেছেন মাত্র ৩ একর ৪৮ শতাংশ জমিতে। তিনি সতর্কভাবে বলছেন, “এবারও যদি দাম ঠিকঠাক না পাই, আমাদের পরিবারের পথ বেঁধে যাবে।”
গত বৃহস্পতিবার সকালে তালতলা বাজারে মাসুম মিয়াসহ পাঁচজন আলুচাষির সঙ্গে আলাপ করা হলে জানা যায়, প্রার্থীরা ভোট চাইছেন, কিন্তু কৃষকের সমস্যা শোনার কেউ নেই। তালতলা বাজার রংপুর–সুন্দরগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে অবস্থিত। পীরগাছা–কাউনিয়া আসনে বর্তমানে তিন প্রধান প্রার্থী রয়েছেন—এনসিপি থেকে আখতার হোসেন, বিএনপি থেকে মোহাম্মদ এমদাদুল হক এবং জাতীয় পার্টি থেকে আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এ তিনজনের মধ্যে।
এলাকার কৃষকেরা বলছেন, “ওরা শুধু ভোট চায়, আলুর সমস্যার কথা কেউ বলছে না।” ছোট কল্যাণী গ্রামের ছলিম উদ্দীন বলেন, “ওমার ভোটের দরকার, খালি ভোট চায়। আলু নিয়্যা কথা কয় না। আমাদের দুঃখের কথা কেউ শোনে না।” গত বছর তিনি দেড় লাখ টাকা লোকসান দিয়েছেন। ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন। মাঠের আলু উঠতে এখনও ৩০–৪০ দিন বাকি।
ছোট কল্যাণী, স্বচাষ, বড়দরগা, কালুক পষুয়া, বড় হাজরা, নব্দিগঞ্জ গ্রামে পরিদর্শনে দেখা গেছে, ৯৫ শতাংশ মানুষ আলু চাষে জড়িত। কেউ নিজের জমিতে চাষ করছেন, কেউ বর্গা নিয়ে। রংপুর জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট কৃষিজমি ১,৮৯,৫১৪ হেক্টর। এর মধ্যে আলু চাষ হয় ২৮–২৯ শতাংশ জমিতে। তবে এ বছর আবাদ কমে ৫৪,৫০০ হেক্টর, যা গত বছরের তুলনায় ১১,৭৮০ হেক্টর কম।
রংপুরে আলু চাষের পরিসংখ্যান (গত দুই বছর)
| বছর | চাষের জমি (হেক্টর) | প্রধান সমস্যা | গড়ে খরচ (টাকা/কেজি) | বিক্রয় মূল্য (টাকা/কেজি) |
|---|---|---|---|---|
| ২০২৫ | ৬৬,২৮০ | হিমাগার কম, মধ্যস্বত্বভোগী | ১৭.৮০ | ৮.০০ |
| ২০২৬ | ৫৪,৫০০ | একই সমস্যা, উচ্চ খরচ | ১৭.৮০ | ৮.০০ |
এলাকার হিমাগার ব্যবস্থাও অপ্রতুল। বেসরকারি হিমাগারে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব থাকায় কৃষকের আলু সংরক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। আলুর মান না হওয়ার কারণে রপ্তানিও কম। এছাড়া, আলু থেকে খাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগও কম। হিমাগারে ভাড়া বেশি হওয়ায় অনেক কৃষক আলু গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বড়দরগা বাজারে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. হোসেন আলী গাজী বলেন, “আলু চাষ এলাকায় অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। অনেক অবকাঠামো, পাকা ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে আলুর কারণে। তবে মানুষ এখন আগ্রহ হারাচ্ছে।” কৃষকরা মনে করছেন, সরকার যদি বড় হিমাগার নির্মাণ করে এবং বীজ, সার ও কীটনাশকের দামে নজরদারি বাড়ায়, তবে চাষে আগ্রহ ফিরে আসবে।
তবুও স্বচাষ গ্রামের সুমন কুমার শর্মা বলেন, “লোকসান হলেও আলু চাষ করতে হবে। কৃষি ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।” তার সঙ্গে ভাই সুজন কুমার শর্মাও মাঠে ইউরিয়া দিচ্ছেন। এ দৃশ্য দেখাচ্ছে, সংকট সত্ত্বেও কৃষকেরা আলু চাষে তাদের আস্থা হারাচ্ছেন না।