খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশি পণ্য ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে মুখরিত হয়ে উঠেছে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ৫৬ জন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার অংশগ্রহণে এখানে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী বিশেষ ‘ঈদ মেলা’। মেলাটিতে অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশই নারী, যারা নিজেদের সৃজনশীলতা ও কঠোর পরিশ্রমে তৈরি করেছেন বৈচিত্র্যময় সব পোশাক, গয়না এবং সুগন্ধি।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬) দুপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাইডাসের চেয়ারম্যান পারভীন মাহমুদ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম খাইরুল বাশার। মেলাটি আগামী শনিবার পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মূলত দেশি নকশা ও হাতের কাজের প্রতি অনুরাগী ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখেই এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে।
মেলায় আগত ক্রেতারা দেশি সুতা, খাদি, তাঁত এবং রাজশাহী সিল্কের তৈরি পোশাকের বিশাল সমাহার দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন। পাট ও চামড়াজাত পরিবেশবান্ধব পণ্যের পাশাপাশি এখানে পাওয়া যাচ্ছে হাতে তৈরি গয়না এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে মিশ্রিত বিশ্বমানের সুগন্ধি।
একনজরে মেলার প্রধান আকর্ষণসমূহ:
| পণ্যের ধরণ | বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও উপকরণ | মূল্যসীমা (আনুমানিক) |
| পোশাক (নারী/পুরুষ) | তাঁত, খাদি, রাজশাহী সিল্ক, নকশী কাঁথা ও বুটিক কাজ | ৭০০ টাকা – ২০,০০০ টাকা |
| পাটের পণ্য | হোগলা পাতা, বাঁশ ও পাটের তৈরি ব্যাগ ও ফ্লোরম্যাট | ৩০০ টাকা – ১,২০০ টাকা |
| হাতে তৈরি গয়না | কাঠ, মাটি ও মেটালের ওপর চারুকলার নিপুণ কারুকাজ | ১০০ টাকা – ৩,০০০ টাকা |
| দেশি সুগন্ধি | বিদেশি অয়েল ও দেশি মিশ্রণে তৈরি ৮০টিরও বেশি ফ্লেভার | ১০০ টাকা – ১,৮০০ টাকা |
| চামড়াজাত পণ্য | দেশি চামড়ার মানসম্মত জুতা, বেল্ট ও মানিব্যাগ | ৮০০ টাকা – ৫,০০০ টাকা |
মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিটি স্টলের পেছনে রয়েছে এক একটি অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প। ‘স্বপ্নীল হাউস’-এর উদ্যোক্তা শারমিন সুলতানা জানান, তিনি তাঁত ও সিল্কের কাপড় দিয়ে তৈরি ব্লেজার ও কটি বিদেশেও রপ্তানি করছেন। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ‘হালাল সার্টিফিকেট’-এর প্রয়োজনীয়তাকে তিনি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, ‘আয়মান’স ক্রিয়েশন’ নামক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা জানান, মাত্র ২০ হাজার টাকা দিয়ে করোনার সময় যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে তার স্টলে ৩ লাখ টাকারও বেশি পণ্য রয়েছে। পরিবেশবান্ধব হোগলা পাতা ও পাটের তৈরি গৃহস্থালি পণ্য বর্তমানে শহরবাসীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
মেলায় তরুণীদের বিশেষ আকর্ষণ দেখা গেছে হাতে তৈরি গয়নার স্টলগুলোতে। ‘ট্রেন্ড অ্যান্ড ট্রেডিশন’-এর উদ্যোক্তা ইমিনা সৃষ্টি জানান, তাদের গয়নাগুলোতে চারুকলার ছোঁয়া থাকায় ক্রেতারা বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। কাঠ ও মাটির প্রলেপে তৈরি এসব গয়নার কাঁচামাল সংগ্রহ করা চ্যালেঞ্জিং হলেও শৌখিন ক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা ব্যাপক।
পাশাপাশি, ‘মোরাক্কাজ’ ও ‘আজান পারফিউম’-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো স্থানীয়ভাবে সুগন্ধি তৈরি করে সাড়া ফেলেছে। ফ্রান্স ও সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা দেশেই সাশ্রয়ী মূল্যে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির পারফিউম সরবরাহ করছে, যা বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের মাঝে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
মেলা পরিদর্শনে আসা সমাপ্তি নামের এক গৃহিণী জানান, “ঈদের কেনাকাটায় দেশি বুটিকের কাপড় সবসময়ই আলাদা আভিজাত্য বহন করে। এখানে অনেক ডিজাইন একসাথে পাওয়া যাচ্ছে, তবে জামদানি শাড়ির সংগ্রহ আরও বেশি থাকলে ভালো হতো।” উদ্যোক্তারা মনে করেন, উপকরণের দাম বাড়লেও ক্রেতারা সস্তায় পণ্য খুঁজতে চান, যা ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসারে একটি বড় বাধা। তবে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন।