মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের একাডেমি ভবনের সামনে দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য তারকা ক্রিকেটারের আনাগোনা চলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে ক্যামেরার লেন্স সর্বদা তাদের ওপর নিবদ্ধ থাকে। তবে এই চেনা ভিড়ের মাঝেও একজন ক্রিকেটার দীর্ঘ সময় ধরে ছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। তিনি অমিত হাসান। নীরবে-নিভৃতে নিজ লক্ষ্যপানে একাগ্র থাকা এই তরুণ ব্যাটার অবশেষে তার কঠোর পরিশ্রমের পুরস্কার পেয়েছেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন তিনি।
ঘরোয়া ক্রিকেটে অমিতের পথচলা
নারায়ণগঞ্জে জন্ম নিলেও অমিত হাসানের ক্রিকেটিং ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরে সিলেটের হয়ে। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক রাজিন সালেহর হাত ধরে তিনি সিলেট বিভাগের হয়ে জাতীয় ক্রিকেট লিগে (এনসিএল) খেলা শুরু করেন। বর্তমান সময়ে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের অতি জনপ্রিয়তার কারণে দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে অর্থাৎ এনসিএল বা বিসিএলে অমিতের মতো ধারাবাহিক পারফরমাররা অনেক সময় প্রচারের আলো থেকে বঞ্চিত হন। তবে পরিসংখ্যান বলছে, অমিত হাসান ঘরোয়া লাল বলের ক্রিকেটে বর্তমান সময়ের অন্যতম সফল ও ধারাবাহিক ব্যাটার।
২০১৯ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার পর থেকে তিনি নির্বাচকদের নজরে ছিলেন। দীর্ঘ সাত বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তিনি জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে ৪৯টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন অমিত, যেখানে তার ব্যাটিং গড় প্রায় ৫০-এর কাছাকাছি। ১১টি শতক হাঁকানো এই ব্যাটারকে উপেক্ষা করা নির্বাচকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।
পরিসংখ্যান ও অর্জনের খতিয়ান
অমিত হাসানের ক্যারিয়ারে অন্যতম বড় সাফল্য হলো জাতীয় ক্রিকেট লিগে এক মৌসুমে ৭০০-র বেশি রান করা। গত এক দশকে মাত্র দুইজন ক্রিকেটার এই মাইলফলক স্পর্শ করতে পেরেছেন। তার ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কিছু পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ/পরিসংখ্যান |
| প্রথম শ্রেণির ম্যাচে অভিষেক | ২০১৯ সাল |
| মোট ম্যাচ (প্রথম শ্রেণি) | ৪৯টি |
| ব্যাটিং গড় | প্রায় ৫০.০০ |
| সেঞ্চুরির সংখ্যা | ১১টি |
| ডাবল সেঞ্চুরি | ০২টি |
| বিসিএল সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স | ১৬২ রান (পূর্বাঞ্চলের হয়ে) |
| বয়স | ২৪ বছর |
প্রস্তুতির দীর্ঘ পরিক্রমা
অমিত হুট করেই জাতীয় দলে চলে আসেননি। তিন-চার বছর ধরে তিনি হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিট এবং বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে নিয়মিত ক্যাম্পে ছিলেন। বিপিএল বা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (ডিপিএল) খুব একটা পরিচিতি না থাকলেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকেই তিনি নিজের প্রধান বিচরণক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) সর্বশেষ রাউন্ডেও পূর্বাঞ্চলের হয়ে ১৬২ রানের একটি ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলে তিনি নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
অনুপ্রেরণা ও আদর্শ
অমিত হাসানের ব্যাটিং দর্শনে প্রভাব রয়েছে রাহুল দ্রাবিড়ের। শৈশবে তিনি ভারতের এই কিংবদন্তি ব্যাটারের খেলা দেখে বড় হয়েছেন। তবে বর্তমানে তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা এবং প্রিয় ক্রিকেটার হলেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিম। এনসিএলে সিলেট বিভাগ এবং বিসিএলে পূর্বাঞ্চলের হয়ে খেলার সুবাদে মুশফিকের সতীর্থ হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছে তার। মুশফিকের নিয়মানুবর্তিতা এবং জীবনযাপনের ধরন অমিতকে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করে। মজার ব্যাপার হলো, মুশফিকের মতো অমিতও একজন উইকেটকিপার-ব্যাটার।
আগামীর লক্ষ্য ও মানসিকতা
জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর থেকে বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অভিনন্দনে সিক্ত হচ্ছেন অমিত। তবে সাফল্যে যেমন তিনি অতি উচ্ছ্বসিত নন, তেমনি ক্যারিয়ারের লম্বা সময় আড়ালে থাকার আক্ষেপও তার নেই। তার মতে, নির্বাচকেরা যখন মনে করেছেন তিনি প্রস্তুত, তখনই তাকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ২৪ বছর বয়সী এই তরুণ ক্রিকেটার বর্তমানে বিশ্বাসী। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার চেয়ে বর্তমানে থেকে নিজের সেরাটা উজাড় করে দেওয়াই তার মূল লক্ষ্য। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অর্জিত দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে তিনি জাতীয় দলের মঞ্চে কাজে লাগাতে চান। জীবনের উত্থান-পতনের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে খারাপ সময়ে সবার সহযোগিতা ও সমর্থনই তার একমাত্র প্রত্যাশা।



