খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
দেশের ভেঙে পড়া ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি একীভূত হওয়া পাঁচটি শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ারের মূল্য ‘শূন্য’ ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই ব্যাংকগুলোর নিট সম্পদের মূল্য (NAV) ভয়াবহভাবে ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে, যার ফলে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানার কোনো অবশিষ্ট আর্থিক মূল্য নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, নবপ্রণীত ‘ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত এই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের মান বর্তমানে এতটাই নিচে যে, গাণিতিক হিসাবে তা নেতিবাচক। এই বাস্তবতাকে আমলে নিয়ে বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের হাতে থাকা শেয়ারগুলোকে রাইট-ডাউন বা অবলোপন করে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর আগে গত নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন যে, শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদের মূল্য ৩৫০ থেকে ৪২০ টাকা পর্যন্ত ঋণাত্মক হয়ে পড়ায় এই শেয়ারহোল্ডাররা নতুন গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’-তে কোনো মালিকানা বা অংশীদারিত্ব পাবেন না।
এই সিদ্ধান্তের ফলে বিনিয়োগকারীরা এক বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ব্যাংকগুলোর ফেস ভ্যালু বা অভিহিত মূল্য অনুযায়ী এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা। তবে পুঁজিবাজারে শেয়ারের দাম আগে থেকেই কম থাকায় বাজারমূল্য হিসেবে বিনিয়োগকারীদের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,০২২ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একীভূতকরণ আদেশের পর থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে এই ব্যাংকগুলোর শেয়ার লেনদেন ইতিমধ্যে স্থগিত করা হয়েছে।
নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করা ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ এখন দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক। গত ৩০ নভেম্বর ব্যাংকটিকে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির মালিকানা ও মূলধন কাঠামো সাজানো হয়েছে সম্পূর্ণ নতুনভাবে, যেখানে আগের মালিকদের কোনো স্থান নেই।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মূলধন ও শেয়ার কাঠামোর বিন্যাস:
| শেয়ারের শ্রেণি | বিনিয়োগের উৎস | পরিমাণ (কোটি টাকা) |
|---|---|---|
| ক্লাস-এ (সরকার) | সরকারি সরাসরি মূলধন সরবরাহ | ২০,০০০ |
| ক্লাস-বি (প্রতিষ্ঠান) | ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী আমানত থেকে রূপান্তর | ৭,৫০০ |
| ক্লাস-সি (প্রাতিষ্ঠানিক) | অন্যান্য অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত থেকে রূপান্তর | ৭,৫০০ |
| মোট পরিশোধিত মূলধন | — | ৩৫,০০০ |
ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০,০০০ কোটি টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া ২০,০০০ কোটি টাকার বাইরে বাকি মূলধন সংগ্রহ করা হয়েছে বড় বড় আমানতকারীদের আমানতকে শেয়ারে রূপান্তর করার মাধ্যমে। সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে শুরু হওয়া ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ফিরবে এবং আর্থিক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা পুনর্স্থাপিত হবে।