খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও শিক্ষাজগতের এক উজ্জ্বল নাম অধ্যাপক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তিনি একাধারে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, কবি, গীতিকার, গবেষক, প্রাবন্ধিক এবং অসাধারণ বক্তা। তাঁর সৃষ্টিশীলতা যেমন বাংলা গানের ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি তাঁর গবেষণা ও প্রবন্ধ বাংলা সাহিত্যচর্চাকে দিয়েছে নতুন দিকনির্দেশনা।
ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৩ মার্চ পাবনা শহরের গোবিন্দা মহল্লায়। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও সংস্কৃতিমনস্ক। ১৯৫২ সালে তিনি পাবনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৫৮ সালে অনার্সসহ বিএ এবং ১৯৫৯ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
পঞ্চাশের দশকে ঢাকাকে কেন্দ্র করে যে নতুন সাহিত্য-সংস্কৃতির জাগরণ তৈরি হচ্ছিল, আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন সেই তরুণ প্রজন্মের অন্যতম সক্রিয় সদস্য। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সংস্কৃতিসেবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর সহযোগিতায় তিনি সম্পাদনা করেন ‘পূর্ব বাংলার কবিতা’ নামে একটি উল্লেখযোগ্য সংকলনগ্রন্থ। তরুণ বয়সেই কবি ও গীতিকার হিসেবে তাঁর প্রতিভার উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটে।
বন্ধু আবু বকর খান, আনোয়ারউদ্দিন খান ও মো. আসফদ্দৌলাসহ তিনি আধুনিক বাংলা গানের চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল পরিমণ্ডল গড়ে তোলেন। তাঁর লেখা বহু গান শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। এর মধ্যে “সেই চম্পা নদীর তীরে” গানটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়, যা গেয়েছিলেন আবু বকর খান। এই গানটি বাংলা গানের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। আবু হেনা ঢাকা বেতারের নিয়মিত শিল্পীও ছিলেন।
তাঁর কবিতা ও গানের বৈশিষ্ট্য হলো গভীর অন্তরঙ্গ অনুভব, সূক্ষ্ম আবেগ, রোমান্টিক আর্তি এবং কখনো কখনো স্বদেশচেতনার শিল্পিত প্রকাশ। ভাষার সৌন্দর্য ও আবেগের মেলবন্ধনে তাঁর রচনা পেয়েছে স্বতন্ত্র মর্যাদা। কবি ও গীতিকার হিসেবে তিনি যেমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, তেমনি টেলিভিশনের একজন বাকপটু উপস্থাপক ও রসিক আলোচক হিসেবেও দর্শকপ্রিয় ছিলেন।
শিক্ষকতা ছিল তাঁর পেশাগত জীবনের প্রধান ক্ষেত্র। কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৬২ সালে তিনি জনসংযোগ পরিদপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। এরপর ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।
১৯৬৬ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য যান। সেখানে “The Bengali Press and Literary Writing (1818–1831)” শীর্ষক গবেষণাভিত্তিক অভিসন্দর্ভ রচনা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলা সাহিত্য ইতিহাস ও সংবাদপত্রের বিকাশ নিয়ে তাঁর এই গবেষণা বিশেষভাবে মূল্যবান।
১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরে ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করে অসংখ্য শিক্ষার্থীর প্রেরণার উৎস হয়ে থাকেন।
প্রশাসনিক দায়িত্বেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডকে তিনি নতুন প্রাণ ও গতি দিয়েছিলেন।
গদ্যসাহিত্যে তাঁর অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবন্ধ, গবেষণা, সমালোচনা ও ভাষ্যে তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সাহিত্যবোধের গভীরতা এবং ভাষার সৌকর্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাংলা সাহিত্য ও বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের মূল্যায়ন করে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ ‘শিল্পীর রূপান্তর’ এবং ‘কথা ও কবিতা’ বাংলাদেশের সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত।
১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এই গুণী মানুষটি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর লেখা গান, কবিতা, প্রবন্ধ এবং গবেষণা আজও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভুবনে অম্লান হয়ে আছে।
জন্মদিনে এই বহুমাত্রিক প্রতিভাধর মানুষটির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। তাঁর সৃষ্টিকর্ম নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগাক—এই প্রত্যাশা।
লেখক
এবি এম জাকিরুল হক টিটন
সম্পাদক ও প্রকাশক
খবরওয়ালা