খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম উজ্জ্বল নাম চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রকর, অলংকরণশিল্পী, নকশাবিদ এবং নান্দনিকতার এক স্বতন্ত্র ধারার নির্মাতা। তাঁর শিল্পকর্মে বাংলার লোকঐতিহ্য, রঙের উচ্ছ্বাস এবং নকশার সুষমা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য শিল্পভুবন।
১৯৩২ সালের ৯ মার্চ ফেনী জেলার এক ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। অর্থনৈতিক জৌলুস না থাকলেও তাঁর পরিবারে ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও উদার মানসিকতার পরিবেশ। সেই সাংস্কৃতিক আবহেই তাঁর শিল্পবোধের বিকাশ ঘটে এবং শৈশব থেকেই তিনি আঁকাআঁকির প্রতি গভীর অনুরাগী হয়ে ওঠেন।
কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্পচর্চা ছিল বহুমাত্রিক। তেলরং, জলরং, কালি-কলম, মোমরং, রেশমছাপসহ নানা মাধ্যমে তিনি সৃজনশীল কাজ করেছেন। তাঁর ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জ্যামিতিক আকার-আকৃতির সৃজনশীল ব্যবহার এবং নকশাধর্মী বিন্যাস। বর্ণিল পটভূমির উপর শক্তিশালী রেখা ও মোটাদাগের নকশা তাঁর অঙ্কনশৈলীকে করেছে স্বতন্ত্র ও সহজে চেনা যায় এমন।
রঙ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাঁর ছিল নিজস্ব এক ভাষা। লাল, নীল ও সবুজ—এই তিনটি রঙ তিনি বিশেষভাবে ব্যবহার করতেন, যা তাঁর চিত্রভাষাকে প্রাণবন্ত ও দীপ্তিময় করে তুলেছে। রঙের এই উজ্জ্বলতা অনেক সময় ফরাসি শিল্পী Henri Matisse-এর কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
তাঁর ক্যানভাসে প্রায়ই দেখা যায় বর্গাকার বিন্যাস এবং বাংলাদেশের লোকজ উপকরণের পুনরাবৃত্ত উপস্থিতি—পুতুল, পাখা, হাঁড়ি, শীতলপাটি, কাঁথা, গ্রামীণ নকশা ইত্যাদি। ফলে তাঁর শিল্পকর্ম শুধু নান্দনিক নয়, একই সঙ্গে বাংলার লোকঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল হিসেবেও বিবেচিত হয়।
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮৬ সালে তাঁকে বাংলাদেশের অন্যতম রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক প্রদান করা হয়। পরে ২০১০ সালে তিনি লাভ করেন সুফিয়া কামাল পদক।
২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর এই প্রথিতযশা শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর তুলির রঙে আঁকা শিল্পভুবন আজও বেঁচে আছে—বাংলাদেশের শিল্পচর্চা, বইয়ের প্রচ্ছদ, নকশা ও সাংস্কৃতিক নান্দনিকতার ভেতর।
বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির আকাশে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
এই মহান শিল্পীর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞ স্মরণ।