খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক ছিলেন সুজেয় শ্যাম। সুর, সংগীত ও দেশপ্রেম—এই তিনের অপূর্ব সম্মিলনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও মুক্তিযুদ্ধের গানের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।
১৯৪৬ সালের ১৪ মার্চ সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী শিল্পী। সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই খুব অল্প বয়সেই তাঁর শিল্পীজীবনের পথচলা শুরু হয়। সুরের প্রতি অসামান্য অনুভব ও সৃজনশীলতা তাঁকে খুব দ্রুতই সংগীত জগতে পরিচিত করে তোলে।
১৯৬৯ সালে সংগীত পরিচালক রাজা হোসেন এর সঙ্গে যৌথভাবে চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা শুরু করেন তিনি। এই জুটি চলচ্চিত্র জগতে “রাজা-শ্যাম” নামে বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করে। সত্তর ও আশির দশকে তাঁরা একসঙ্গে প্রায় পঁচিশটি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন। এর মধ্যে সূর্যগ্রহণ, সূর্য সংগ্রাম এবং ভুল যখন ভাঙল উল্লেখযোগ্য।
“সূর্যগ্রহণ” চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনার জন্য তিনি লাভ করেন বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যুক্ত ছিলেন ঐতিহাসিক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে। সেখানে তিনি কণ্ঠযোদ্ধা ও সংগীতসৈনিক হিসেবে কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী অসংখ্য গান সেই সময় বেতার তরঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, যা মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মনে স্বাধীনতার অদম্য সাহস জাগিয়ে তুলেছিল।
১৯৮৬ সালে আব্দুল লতিফ বাচ্চু পরিচালিত বলবান চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি এককভাবে সংগীত পরিচালনা শুরু করেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে বহু চলচ্চিত্রে সুরারোপ করে তিনি নিজস্ব স্বকীয়তার পরিচয় দেন।
একুশ শতকের শুরুতে কিংবদন্তি বাউল সাধক হাসন রাজা–কে নিয়ে নির্মিত হাছন রাজা চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করে তিনি অর্জন করেন তাঁর প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এই চলচ্চিত্রের একটি গানে চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম এর বিশেষ অনুরোধে তিনি নিজেই কণ্ঠ দেন।
মুক্তিযুদ্ধের সংগীতভাণ্ডার সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০০৬ সালে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত ৪৬টি গানের সংকলন নিয়ে তিনি “স্বাধীন বাংলা বেতারের গান” শিরোনামের একটি অ্যালবামের সংগীত পরিচালনা করেন—যা মুক্তিযুদ্ধের সংগীত ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়।
২০১৪ সালে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একাত্তরের ক্ষুদিরাম ও একাত্তরের মা জননী চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেও তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।
বাংলাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা একুশে পদক এবং শিল্পকলা পদক এছাড়াও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২১-এ তিনি শ্রেষ্ঠ সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে মনোনীত হন।
২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর প্রভাতে এই মহান শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর সুর, তাঁর দেশপ্রেম আর তাঁর সৃষ্ট সংগীত চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
এই মহান শব্দসৈনিকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রনাম।